রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে আরও বড় আকারে সেনা নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে মস্কো অতিরিক্ত ৩ লাখ সেনা মোতায়েন বা সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। রাশিয়ার সেপ্টেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই নতুন করে সেনা সংগ্রহের উদ্যোগ জোরদার হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
জেলেনস্কির এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস অঞ্চলে রুশ বাহিনী তাদের অভিযান আরও জোরদার করেছে। বিশেষ করে দোনেৎস্ক অঞ্চলের বাকি অংশ দখলে নিতে মস্কো যে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, নতুন সেনা সংগ্রহ তারই অংশ হতে পারে বলে মনে করছে কিয়েভ।
নির্বাচনের পরই নতুন সেনা সংগ্রহ?
২৩ আগস্ট প্রকাশিত বক্তব্যে জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া সেপ্টেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর অতিরিক্ত ৩ লাখ সেনা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়াটি রাশিয়ার বড় শহরগুলোতে ব্যাপকভাবে না করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোকে বেশি লক্ষ্য করে চালানো হতে পারে।
জেলেনস্কি এটিকে ‘peripheral mobilisation’ বা প্রান্তিক অঞ্চলে সেনা সংগ্রহের একটি পরিকল্পনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, মস্কো এমনভাবে উদ্যোগটি পরিচালনা করতে চাইতে পারে, যাতে রাশিয়ার প্রধান নগরগুলোতে ব্যাপক সামাজিক প্রতিক্রিয়া তৈরি না হয়। তবে এত বড় সংখ্যক মানুষকে সামরিক বাহিনীতে নেওয়া গোপন রাখা কঠিন হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচন সেপ্টেম্বরের ১৮ থেকে ২০ তারিখে হওয়ার কথা। এর পরেই নতুন সেনা সংগ্রহ শুরু হতে পারে—এমন আশঙ্কা গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ইউক্রেন ও পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের মধ্যে রয়েছে।
লক্ষ্য কি দোনেৎস্কের পুরো নিয়ন্ত্রণ?
জেলেনস্কির বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার বড় লক্ষ্য হলো ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের শিল্পসমৃদ্ধ ডনবাস, বিশেষ করে দোনেৎস্ক অঞ্চলের অবশিষ্ট অংশ দখল করা। রুশ বাহিনী ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে এবং কস্তিয়ান্তিনিভকা ও আশপাশের এলাকায় তীব্র লড়াই চলছে।
তবে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের দাবি, রুশ বাহিনী অগ্রসর হলেও এর জন্য তাদের বড় ধরনের জনবল ক্ষয় হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর রাশিয়ার ২ লাখ ৬৭ হাজার সেনা হতাহত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার নিহত। এসব সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন হিসাবও রাশিয়ার বড় ধরনের জনবল ক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে ৩ লাখ সেনা সংগ্রহের পরিকল্পনা যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার জনবল ঘাটতি পূরণের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৭ সালেও আসতে পারে আরও সেনা
শুধু চলতি বছর নয়, ২০২৭ সালেও রাশিয়া আরও কয়েক লাখ মানুষকে সেনাবাহিনীতে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মস্কোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মোটামুটি ৫ লাখ পর্যন্ত নতুন সেনা সংগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এর অর্থ হলো, যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার বদলে রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন আশঙ্কাই জোরালো হচ্ছে।
২০২২ সালের অভিজ্ঞতা কি আবার ফিরবে?
রাশিয়ার জন্য নতুন করে বড় আকারের সেনা সংগ্রহ রাজনৈতিকভাবেও ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়ার আংশিক সামরিক সমাবেশের ঘোষণার পর দেশটিতে বিক্ষোভ এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের বিদেশে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
এবার মস্কো সেই ধরনের প্রতিক্রিয়া এড়াতে তুলনামূলকভাবে নীরব ও আঞ্চলিকভিত্তিক পদ্ধতি বেছে নিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। পশ্চিমা কর্মকর্তারাও রাশিয়ার সম্ভাব্য নতুন মোবিলাইজেশন নিয়ে সতর্ক করছেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ৩ লাখ নতুন সেনা মোবিলাইজ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে—এমন তথ্য এখনো নেই। এটি মূলত জেলেনস্কির দেওয়া গোয়েন্দা-ভিত্তিক সতর্কবার্তা। ফলে পরিকল্পনাটি ঠিক কীভাবে এবং কখন বাস্তবায়িত হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এর মধ্যেই ইউক্রেনকে আরও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন জেলেনস্কি। তাঁর আশঙ্কা, রাশিয়া একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়ে শীত মৌসুমে ইউক্রেনের জ্বালানি ও অবকাঠামোর ওপর নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।
সব মিলিয়ে, আরও ৩ লাখ সেনা সংগ্রহের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেন যুদ্ধ নতুন একটি ভয়াবহ পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। শান্তি আলোচনা যখন অচলাবস্থায়, তখন মস্কোর সম্ভাব্য এই জনবল বৃদ্ধির পরিকল্পনা যুদ্ধের সমাপ্তির বদলে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে।
