মধ্য এশিয়ার কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) ২৬তম শীর্ষ সম্মেলন। ১ সেপ্টেম্বর কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরান, পাকিস্তানসহ ১০ সদস্য দেশের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। সংগঠনটির ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বছরে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন, অর্থনীতি, জ্বালানি, যোগাযোগ, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো ‘বিশকেক ঘোষণাপত্র’ বা Bishkek Declaration। এর পাশাপাশি SCO চারটি সমঝোতা স্মারক এবং নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও মানবিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ২০টির বেশি সিদ্ধান্ত ও বিবৃতি গ্রহণ করেছে। SCO-এর নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলনের শেষে মোট ২৮টি ফলাফলভিত্তিক নথি অনুমোদিত হয়।
ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
বিশকেক ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, মাদকপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় সদস্য দেশগুলোর সহযোগিতা আরও জোরদারের কথা বলা হয়েছে। ঘোষণাপত্রে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ‘দ্বৈত মানদণ্ড’ বা double standards গ্রহণযোগ্য নয়—এমন অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে।
SCO নেতারা জোর দিয়েছেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় আইনের প্রতি সম্মান বজায় রেখে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী সংগঠনের অর্থায়ন, নিয়োগ, উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার এবং সীমান্তপারের নিরাপদ আশ্রয় বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তৈরি হচ্ছে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো
সম্মেলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত হলো SCO Universal Centre for Countering Security Challenges and Threats প্রতিষ্ঠার বিধি অনুমোদন। পাশাপাশি SCO Anti-Drug Centre-এর কার্যক্রমের জন্যও নতুন বিধি অনুমোদন করা হয়েছে।
এর ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, সন্ত্রাসবাদ ও সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা এবং মাদকপাচার প্রতিরোধে সমন্বিত কাঠামো আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ইংরেজি পেল SCO-এর সরকারি ও কার্যকরী ভাষার মর্যাদা
সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ইংরেজি ভাষাকে SCO-এর সরকারি ও কার্যকরী ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত। এতদিন সংগঠনটির কার্যক্রমে প্রধানত রুশ ও চীনা ভাষা ব্যবহৃত হতো। ইংরেজি যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, নথি প্রকাশ এবং সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতি, যোগাযোগ ও জ্বালানিতে বাড়ছে সহযোগিতা
বিশকেক সম্মেলনে SCO শুধু নিরাপত্তা ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শিল্প, সরবরাহব্যবস্থা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সম্মেলনে SCO দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, জ্বালানি, আর্থিক সহযোগিতা, শিল্প ও supply chain এবং connectivity আরও গভীর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ করার পক্ষে SCO-এর ভূমিকা জোরদারের কথাও বলেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও উন্নয়নকে SCO সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান ইস্যুতেও অবস্থান
সম্মেলনের আলোচনায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। Bishkek Declaration-এ ইরানের ভূখণ্ডে সামরিক হামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ এবং বেসামরিক প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সদস্য দেশগুলো উত্তেজনা কমানো, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে সংঘাতের সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
এখানে ভারতের অবস্থানও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ইরান ইস্যুতে SCO-এর অবস্থানের সঙ্গে ভারতও যুক্ত হয়েছে, যা সংগঠনটির অভ্যন্তরে বড় শক্তিগুলোর মধ্যে কিছু বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
পাকিস্তানের হাতে পরবর্তী নেতৃত্ব
বিশকেক সম্মেলনের শেষে SCO-এর ২০২৬–২৭ মেয়াদের সভাপতিত্ব পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান জানিয়েছে, তাদের সভাপতিত্বের মূল থিম হবে—“Turning Vision into Action: Connectivity, Innovation and Shared Prosperity”।
অর্থাৎ আগামী এক বছরে SCO-র আলোচনায় শুধু রাজনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা নয়, বরং আঞ্চলিক যোগাযোগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং যৌথ অর্থনৈতিক উন্নয়নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চীন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতা, ভারতের ভারসাম্যনীতি
সম্মেলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে চীন, রাশিয়া ও ভারতের শীর্ষ নেতাদের একই প্ল্যাটফর্মে উপস্থিতির কারণে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্মেলনের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও করেন এবং চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে কথা বলেন।
অন্যদিকে ভারত একই সংগঠনের সদস্য হয়েও চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে নিজস্ব কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখে SCO-কে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে।
এ কারণেই SCO-কে অনেক সময় পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক কাঠামোর সম্ভাব্য ভারসাম্যকারী শক্তি হিসেবে দেখা হলেও, ভারত-চীন এবং ভারত-পাকিস্তানের মতপার্থক্য সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ ঐক্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।
২৫ বছর পর নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত
২০২৬ সালে SCO তার ২৫ বছর পূর্ণ করেছে। বিশকেক সম্মেলনে সেই দুই দশকের বেশি সময়ের অর্জন পর্যালোচনার পাশাপাশি আগামী দিনের জন্য সংগঠনটিকে আরও কার্যকর করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ঘোষণাপত্র, নতুন নিরাপত্তা কেন্দ্র, মাদকবিরোধী কাঠামো, ইংরেজি ভাষার অন্তর্ভুক্তি এবং অর্থনৈতিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা—সব মিলিয়ে এবারের সম্মেলনকে শুধু আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠক হিসেবে দেখার সুযোগ কম।
বিশ্ব যখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও নতুন অর্থনৈতিক ব্লকের প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন চীন, রাশিয়া, ভারত, ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার SCO-এর সক্ষমতা আগামী দিনের ইউরেশীয় ভূরাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশকেক ঘোষণাপত্র সেই পরিবর্তনের একটি রাজনৈতিক রূপরেখা দিয়েছে। এখন মূল প্রশ্ন—ঘোষণাপত্রের সিদ্ধান্তগুলো কতটা বাস্তব সহযোগিতায় রূপ নেয়।
