সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুদের হাতে জিম্মি থাকা একটি তেলবাহী জাহাজ উদ্ধারের অভিযানে পাঁচ নাবিক নিহত হয়েছেন। প্রায় পাঁচ মাস ধরে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে থাকা জাহাজটি পুনরুদ্ধারের পর ঘটনাটি নতুন করে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিহতদের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি, একজন মিয়ানমারের এবং একজন ভারতের নাগরিক।
২০২৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সোমালিয়ার আধা-স্বায়ত্তশাসিত পুন্টল্যান্ড অঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনী এমটি অনার ২৫ নামের জাহাজটি উদ্ধারের অভিযান চালায়। এর পরদিন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ঘটনাটির বিস্তারিত প্রকাশ করে।
জাহাজটিতে মোট ১৭ জন নাবিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন নিহত এবং চারজন আহত হন। অভিযানের পর ১৬ জন সন্দেহভাজন জলদস্যুকে আটক করা হয়। তবে অন্তত ১১ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
পাঁচ মাস ধরে জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে ছিল জাহাজ
এমটি অনার ২৫ জাহাজটি ২০২৬ সালের এপ্রিলে সোমালিয়ার উপকূলের কাছে ছিনতাই করা হয়। জাহাজটি প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ ব্যারেল জ্বালানি বহন করছিল।
জাহাজটি ছিনতাইয়ের পর নাবিকদের দীর্ঘ সময় জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হয়। পুন্টল্যান্ডের সামুদ্রিক পুলিশ জানিয়েছে, জিম্মি অবস্থায় নাবিকদের খাবার সরবরাহ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার অভিযানের সময় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ নাবিকের মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছে। দেশটির নাগরিকদের মরদেহ ফেরত আনা এবং আহতদের চিকিৎসা ও প্রত্যাবাসনের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।
উদ্ধার অভিযানে কী ঘটেছিল
পুন্টল্যান্ডের নিরাপত্তা বাহিনী মঙ্গলবার জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় জলদস্যুদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযান শেষে জাহাজটি নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়। ১৬ জন সন্দেহভাজন জলদস্যুকে আটক করা হলেও অন্যদের খোঁজে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
তবে নাবিকদের মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে সব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাঁরা সরাসরি জলদস্যুদের হামলায় নিহত হয়েছেন, নাকি উদ্ধার অভিযানের সময় গোলাগুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত প্রয়োজন।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘটনার দায় নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান পরিচালনার কৌশল নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের ভূমিকা রয়েছে।
সোমালিয়ায় জলদস্যুতার নতুন উদ্বেগ
একসময় সোমালিয়ার উপকূল বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক সামুদ্রিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ২০১০-এর দশকের শুরুতে সোমালি জলদস্যুরা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই করে বিপুল মুক্তিপণ আদায় করত।
আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর অভিযান, জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সোমালিয়ার উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারের ফলে পরবর্তী সময়ে জলদস্যুতার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এমটি ইউরেকা নামের আরেকটি তেলবাহী জাহাজও ২০২৬ সালের মে মাসে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল। পরে সেটির নাবিকদের নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
এই ধারাবাহিক ঘটনা সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যুতা আবার বাড়ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
সোমালিয়ার উপকূল আরব সাগর, এডেন উপসাগর এবং লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথের কাছাকাছি। এ অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে প্রভাব পড়তে পারে।
জলদস্যুতার ঝুঁকি বাড়লে জাহাজের বিমা ব্যয়, নিরাপত্তা খরচ এবং পরিবহন সময় বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য পরিবহনকারী জাহাজগুলো বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ কারণে শুধু স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক নৌবাহিনী, উপকূলীয় রাষ্ট্র এবং বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
এমটি অনার ২৫-এর ঘটনায় পাঁচ নাবিকের মৃত্যু সোমালিয়ার জলদস্যুতা সমস্যাকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনায় এনেছে। এখন তদন্ত, আটক সন্দেহভাজনদের বিচার এবং উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদার করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে প্রধান কাজ।
