যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের বার্তা আরও জোরালো করতে কিয়েভ সফরে গিয়েছেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কিয়েভে পৌঁছে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা এসেছে ইউক্রেনের নিজস্ব দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এমবিডিএকে ব্রিটিশ প্রযুক্তিসংক্রান্ত গোপন তথ্য প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হবে, যাতে ফ্রান্স ও ইউক্রেন যৌথভাবে ইউক্রেনের ভেতরে এসসিএএলপি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের অ্যাসেম্বলি লাইন স্থাপনের কাজ এগিয়ে নিতে পারে। এসসিএএলপি ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিটেনের স্টর্ম শ্যাডোর সঙ্গে যৌথ ব্রিটিশ-ফরাসি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
স্বাধীনতা দিবসে শক্তিশালী বার্তা
ইউক্রেনের স্বাধীনতার ৩৫তম বার্ষিকীর দিনেই কিয়েভ সফর করেন বার্নহ্যাম। রাশিয়ার বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের মধ্যে দেশটির জন্য দিনটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ইউক্রেনীয় নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি ইউরোপীয় নেতাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’-এর বৈঠকেও সভাপতিত্ব করেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।
এই জোটের সদস্য দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সহায়তা এবং ভবিষ্যৎ শান্তি প্রচেষ্টায় সমন্বিত ভূমিকা রাখার বিষয়ে কাজ করছে। কিয়েভ সফরের মাধ্যমে বার্নহ্যাম ইউক্রেনকে শুধু প্রতীকী সমর্থনই দেননি, বরং যুদ্ধের ভবিষ্যৎ পর্যায়ে ব্রিটেনের সক্রিয় ভূমিকার ইঙ্গিতও দিয়েছেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে দূরপাল্লার অস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সরবরাহ করা অস্ত্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকার পরিবর্তে দেশটির ভেতরে অস্ত্র উৎপাদন ও অ্যাসেম্বলি লাইন গড়ে তোলাকে এখন কিয়েভ কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে।
এসসিএএলপি ক্ষেপণাস্ত্রের ব্রিটিশ সংস্করণ স্টর্ম শ্যাডো এরই মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধ সক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফ্রান্স ও ইউক্রেন স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের পথে এগোতে পারবে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করতে পারে, যদিও ইউক্রেনে তৈরি এসব ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
রাশিয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া
ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্রেমলিন। রুশ কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ব্রিটিশ সহায়তা যুদ্ধকে আরও উসকে দেবে এবং শান্তি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ব্রিটেনের এই পদক্ষেপকে সংঘাত আরও তীব্র করার উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রাশিয়া জানিয়েছে, ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন স্থাপনাগুলোর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রাশিয়ার হুমকির সমালোচনা করে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় ব্রিটেনের বার্তা
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হচ্ছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি। এ পরিস্থিতিতে বার্নহ্যামের কিয়েভ সফর এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে নতুন সহায়তার ঘোষণা ইউক্রেনের জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
তবে এই সহায়তা যুদ্ধের গতিপথ কতটা বদলাবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, ইউক্রেনের শিল্প সক্ষমতা এবং পশ্চিমা মিত্রদের ভবিষ্যৎ সামরিক সহায়তার ওপর। আপাতত কিয়েভ সফরের মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন—রাশিয়ার চাপ ও হুমকির মধ্যেও ইউক্রেনকে একা ফেলে দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না লন্ডন।
