মধ্য এশিয়ার সামরিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। উজবেকিস্তানের বিমানবাহিনীতে চীনের তৈরি Chengdu J-10CE মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান যুক্ত হওয়ার খবর সামনে আসার পর অঞ্চলটির প্রতিরক্ষা সমীকরণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, তাশখন্দ ইতোমধ্যে কয়েকটি J-10CE পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে মোট ২৪টি বিমান সংগ্রহ করতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উজবেকিস্তান বা চীন এখনো এই চুক্তি বা সরবরাহ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
যদি খবরটি নিশ্চিত হয়, তাহলে এটি উজবেকিস্তানের সামরিক আধুনিকায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হবে। কারণ দেশটির বিমানবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে মূলত সোভিয়েত ও রুশ প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধবিমান এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল। চীনা J-10CE যুক্ত হলে সেই নির্ভরতার পাশাপাশি একটি নতুন সরবরাহকারী ও প্রযুক্তিগত অংশীদার যুক্ত হবে।
J-10CE হলো চীনের Chengdu J-10C যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। এটি বহুমুখী যুদ্ধবিমান হিসেবে আকাশযুদ্ধ, স্থল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত এবং বিভিন্ন ধরনের আধুনিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য তৈরি। এর আধুনিক অ্যাভিওনিক্স, রাডার ও অস্ত্র ব্যবস্থার কারণে বিমানটি আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উজবেকিস্তানের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য এই অধিগ্রহণের সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য হলো—মধ্য এশিয়ার অস্ত্রবাজারে চীনের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে কাজাখস্তান, উজবেকিস্তানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সামরিক সরঞ্জামের প্রধান উৎস ছিল রাশিয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন ধীরে ধীরে সেই বাজারে প্রবেশ করছে।
উজবেকিস্তানের সঙ্গে চীনের সামরিক সহযোগিতা অবশ্য নতুন নয়। তাশখন্দ এর আগেও চীনা ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে। ফলে J-10CE যদি সত্যিই উজবেক বিমানবাহিনীতে যুক্ত হয়, তাহলে এটি একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের পরবর্তী ধাপ হতে পারে।
রাশিয়ার জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য এশিয়া ঐতিহাসিকভাবে মস্কোর গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রভাববলয়। রুশ অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও সামরিক অবকাঠামোর সঙ্গে এই অঞ্চলের দেশগুলোর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার সামরিক উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। সেই সুযোগে চীন মধ্য এশিয়ার অস্ত্রবাজারে নিজের জায়গা বাড়াচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন।
তবে J-10CE কেনার অর্থ উজবেকিস্তান রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। মধ্য এশিয়ার দেশগুলো সাধারণত একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করে। উজবেকিস্তানও রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ইউরোপ এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে একইসঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
সম্ভাব্য ২৪টি J-10CE সংগ্রহের খবর সত্য হলে উজবেকিস্তানের বিমানবাহিনীর সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা শুধু বিমান সংগ্রহের বিষয় নয়। এর সঙ্গে পাইলট প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, অস্ত্র, খুচরা যন্ত্রাংশ, রানওয়ে অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি লজিস্টিক ব্যবস্থাও জড়িত।
এ কারণেই চীনা যুদ্ধবিমান গ্রহণের সিদ্ধান্ত উজবেকিস্তানের সামরিক কাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে এটি মধ্য এশিয়ায় চীন-রাশিয়া প্রতিযোগিতার একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
আরও একটি বিষয় নজরে রাখার মতো। J-10CE-এর সম্ভাব্য উজবেক ব্যবহার চীনের যুদ্ধবিমান রপ্তানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের পর নতুন কোনো মধ্য এশীয় দেশ যদি এই প্ল্যাটফর্ম গ্রহণ করে, তাহলে চীনের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এটি একটি বড় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—উজবেকিস্তান আসলে কতটি J-10CE কিনেছে এবং বিমানগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির বিমানবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চারটি বিমান সরবরাহের দাবি উঠলেও তাশখন্দ ও বেইজিংয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে, J-10CE ঘিরে এই সম্ভাব্য চুক্তি মধ্য এশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষায় একটি নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি শুধু একটি যুদ্ধবিমান কেনার খবর নয়—বরং অঞ্চলটির অস্ত্রবাজারে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং রাশিয়ার ঐতিহাসিক সামরিক আধিপত্যের পরিবর্তনশীল চিত্রেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
