একদিকে ধ্বংসস্তূপে চলছে নিখোঁজদের সন্ধান, অন্যদিকে হাসপাতাল ও মর্গে জমছে পরিচয়হীন মৃতদেহ। নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পর মানবিক সংকট এখন নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় সবগুলো সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর কিছু অজ্ঞাত মৃতদেহ অস্থায়ীভাবে গণকবর দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
২৬ আগস্টের দুর্যোগে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে একসঙ্গে বহু মানুষ প্রাণ হারান। পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে অনেক মরদেহ ভেসে যায় বা কাদা-পাথরের নিচে চাপা পড়ে। কিছু মরদেহ উদ্ধার হলেও পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। পরিবারের সদস্যরা হাসপাতাল ও শনাক্তকরণ কেন্দ্রে গিয়ে প্রিয়জনের খোঁজ করছেন।
এই পরিস্থিতিতে ডিএনএ প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে আশার অন্যতম বড় মাধ্যম। উদ্ধার হওয়া মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও ডিএনএ নেওয়া হচ্ছে। পরে দুই পক্ষের জেনেটিক তথ্য মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একটি পরিবারের জন্য এর অর্থ কতটা গভীর, তার উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে। বহু মানুষ জানেন না তাঁদের স্বজন বেঁচে আছেন, নাকি মৃত। কারও মরদেহ পাওয়া গেছে, কিন্তু পরিচয় নিশ্চিত হয়নি। ফলে ডিএনএ পরীক্ষাই অনেক পরিবারের কাছে শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতও এ কাজে সহায়তা করছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল নেপালে গিয়ে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও মৃতদেহ শনাক্তকরণে সহায়তা করছে। চীনও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
কিন্তু সমস্যার আরেকটি দিক হলো সময়। মরদেহ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা কঠিন। পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই কিছু মরদেহ দ্রুত দাফন বা সমাহিত করার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।
নেপাল কর্তৃপক্ষ তাই মরদেহের ডিএনএ, ছবি ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্য সংরক্ষণ করে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
এই পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য বা ফরেনসিক সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটও। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক পরিবারে মৃত স্বজনের শেষকৃত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক পরিবার স্বাভাবিকভাবে শোক পালনও করতে পারছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিখোঁজের বিশাল সংখ্যা। সর্বশেষ বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী নেপালে প্রায় চার হাজার থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। এই সংখ্যার মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের দুর্যোগে দ্রুত ডিএনএ ডাটাবেস তৈরি, মৃতদেহের ডিজিটাল রেকর্ড এবং পরিবারের নমুনা সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি ভবিষ্যতে হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্যও বড় শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
কারণ ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধার অভিযান একদিন শেষ হবে। কিন্তু যেসব পরিবার এখনো জানে না তাদের স্বজনের কী হয়েছে, তাদের অপেক্ষা শেষ হবে কেবল তখনই—যখন একটি পরিচয় নিশ্চিত হবে।
একটি ডিএনএ রিপোর্ট তাই এখন নেপালের হাজারো পরিবারের কাছে শুধু একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়; এটি সত্য জানার শেষ আশার নাম।
