সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের মঞ্চে আবারও মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে দুই দেশের প্রতিনিধিরা কাশ্মীর, ধর্মীয় স্বাধীনতা, বৈষম্য এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এনেছেন। বক্তব্যের পাল্টাপাল্টিতে স্পষ্ট হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় বিরোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে সক্রিয় দুই দেশ।
জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদের ৬৩তম অধিবেশনে পাকিস্তানের প্রতিনিধি ভারতের বিরুদ্ধে কাশ্মীর ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। জবাবে ভারতীয় প্রতিনিধি পাকিস্তানের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে দেশটির নিজস্ব সংখ্যালঘু পরিস্থিতি ও মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে পাল্টা বক্তব্য দেন।
পাকিস্তানের অভিযোগের কেন্দ্রে কাশ্মীর
পাকিস্তানের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, জম্মু ও কাশ্মীরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ভারত বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ সামনে আনে। তিনি কাশ্মীরকে বিতর্কিত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিক নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব অনুযায়ী জনগণের মতামত নেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
পাকিস্তানের বক্তব্যে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার আটক, নির্যাতন এবং নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগও উঠে আসে। দেশটির প্রতিনিধি বিশেষ ক্ষমতাসংক্রান্ত আইন এবং ২০১৯ সালের পর কাশ্মীরের প্রশাসনিক ও আইনি পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সংখ্যালঘু অধিকার প্রসঙ্গে পাকিস্তান ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্থাপনা এবং নাগরিকত্ব আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের দাবি, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের পরিবেশ সংখ্যালঘুদের অধিকারকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ভারতের পাল্টা বক্তব্য
পাকিস্তানের বক্তব্যের জবাবে ভারতীয় প্রতিনিধি অভিযোগগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেন। ভারতের অবস্থান, জম্মু ও কাশ্মীর দেশটির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং পাকিস্তানই অঞ্চলটির একটি অংশ অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। ভারতীয় প্রতিনিধি পাকিস্তানের বক্তব্যকে ইতিহাসের বিকৃত ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরেন।
ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশটির মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা নির্বাচনে অংশ নেন, আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করেন এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানের নিজস্ব সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভারতীয় প্রতিনিধি বলেন, অন্য দেশের মানবাধিকার নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার আগে পাকিস্তানের উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দিকে নজর দেওয়া।
ভারতীয় বক্তব্যে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থান এবং মানবাধিকার রেকর্ড নিয়েও সমালোচনা করা হয়। ফলে আলোচনার মূল বিষয় সংখ্যালঘু অধিকার হলেও দুই দেশের দীর্ঘদিনের কাশ্মীর বিরোধই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।
জাতিসংঘের মঞ্চে কেন এমন বিতর্ক
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে সদস্যরাষ্ট্রগুলো মানবাধিকার পরিস্থিতি, বৈষম্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পায়। কোনো দেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট দেশ সাধারণত ‘রাইট অব রিপ্লাই’ বা জবাব দেওয়ার অধিকার ব্যবহার করে নিজের অবস্থান তুলে ধরে।
ভারত ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে এই মঞ্চে একে অপরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে আসছে। কাশ্মীর প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। পাকিস্তান জাতিসংঘের পুরোনো প্রস্তাব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা তুলে ধরে। অন্যদিকে ভারত বলে, কাশ্মীর তার অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং পাকিস্তানের কোনো হস্তক্ষেপের অধিকার নেই।
এই বিরোধের সঙ্গে সংখ্যালঘু অধিকার যুক্ত হওয়ায় বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। একদিকে ভারতের অভ্যন্তরে মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের অভিযোগ, অন্যদিকে পাকিস্তানের হিন্দু, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে ভারতের পাল্টা প্রশ্ন—দুই পক্ষই আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
অভিযোগ ও বাস্তবতার ব্যবধান
জাতিসংঘের মঞ্চে দেওয়া বক্তব্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানের অংশ। তাই কোনো প্রতিনিধির অভিযোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ সংস্থা, স্বাধীন তদন্ত, আদালতের নথি এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্যবিষয়ক কমিটি ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা, নির্বিচার আটক এবং বৈষম্যের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। রোহিঙ্গা ও বাংলাভাষী মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ঝুঁকি নিয়েও কমিটি সুপারিশ দেয়। এসব পর্যবেক্ষণ বিতর্ককে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। ফলে দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের বাইরে উভয় রাষ্ট্রের জন্যই মানবাধিকার সুরক্ষার বাস্তব অগ্রগতি জরুরি।
কূটনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব
জাতিসংঘে এই বিতর্ক ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিদ্যমান অবিশ্বাসকে আরও দৃশ্যমান করেছে। দুই দেশের মধ্যে সংলাপ সীমিত থাকায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে এমন বক্তব্য প্রায়ই দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বিকল্প ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। তবে কূটনৈতিক বক্তব্যের বাইরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, বৈষম্য দূর করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের মতো বিষয়গুলোই সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
জাতিসংঘের মঞ্চে কে কাকে কতটা জবাব দিল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেদের নাগরিকদের অধিকার কতটা নিশ্চিত করতে পারছে। ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বিতর্ক সেই প্রশ্নটিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
