যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কে নতুন করে বড় ধরনের ধাক্কা এসেছে। গতকাল, ২২ আগস্ট থেকে কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে অটোয়া। ফলে দুই ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর মধ্যকার বাণিজ্যিক বিরোধ এখন কার্যত নতুন পর্যায়ের বাণিজ্যযুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
শেষ মুহূর্তের আলোচনা, তবু সমঝোতা হলো না
শুক্রবার, ২১ আগস্ট পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে তীব্র আলোচনা চলছিল। দুই দেশই শেষ মুহূর্তে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল। এমনকি আলোচনার এক পর্যায়ে ধারণা করা হয়েছিল, কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ি শিল্পের ওপর থাকা কিছু শুল্ক কমানো এবং বাণিজ্যিক বাধা শিথিল করার বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বড় ধরনের মতপার্থক্য থেকেই যায়। বিশেষ করে মাঝারি ও ভারী যানবাহনের শুল্ক এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যনীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রস্তাব কানাডার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। কানাডার পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দাবি দেশটির সার্বভৌমত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও আপত্তি জানানো হয়।
ফলে শুক্রবার রাতেই সমঝোতার সম্ভাবনা কার্যত ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও জানান, কানাডা একটি সুযোগ হারিয়েছে এবং আপাতত নতুন কোনো আলোচনা নির্ধারিত নেই।
২০ বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্যে ৫০% শুল্ক
শনিবার ভোর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ ট্যারিফ কার্যকর হয়। এর আওতায় পড়েছে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে দুগ্ধজাত পণ্য, ওয়াইন ও অন্যান্য অ্যালকোহল, সিমেন্ট, ইলেকট্রনিকস, আসবাবপত্র, খেলাধুলার সরঞ্জামসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্য।
তবে কানাডার সব পণ্যের ওপর এই নতুন শুল্ক বসছে না। জ্বালানি, পটাশ, মাছ ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ বেশ কিছু পণ্য এই নতুন ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কানাডা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন পণ্যকে বিভিন্নভাবে বাণিজ্যিক বাধার মুখে ফেলছে। বিশেষ করে গাড়ি, অ্যালকোহল ও চিজ আমদানির ক্ষেত্রে কানাডার নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। হোয়াইট হাউসের যুক্তি অনুযায়ী, কানাডার কিছু নীতি মার্কিন রপ্তানিকারকদের অন্য দেশের তুলনায় অসুবিধায় ফেলছে।
‘ডলার ফর ডলার’ পাল্টা জবাব কানাডার
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কার্যকর হওয়ার পরই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি কঠোর অবস্থান নেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাবে কানাডা ৮ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে।
কার্নির ভাষায়, এটি কানাডার শ্রমিক ও শিল্পকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্ব স্বীকার করলেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কানাডা একতরফা চাপ মেনে নেবে না।
কানাডার নতুন পাল্টা শুল্কের আওতায় মার্কিন স্টিল, ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন পণ্য পড়বে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই দুই দেশের বাজারে একে অপরের পণ্যের ওপর আরও বেশি শুল্ক কার্যকর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কানাডার শিল্পে বাড়ছে উদ্বেগ
এই বাণিজ্য সংঘাত কানাডার শিল্প ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার; কানাডার মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে মার্কিন বাজারে অতিরিক্ত শুল্ক কানাডীয় উৎপাদকদের জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে যেসব কানাডীয় কোম্পানি মার্কিন ক্রেতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের উৎপাদন খরচ ও পণ্যের চূড়ান্ত দাম বাড়তে পারে। অন্যদিকে মার্কিন আমদানিকারকরাও কানাডীয় পণ্যের জন্য বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হলে তার প্রভাব মার্কিন বাজারেও পড়তে পারে।
কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও শ্রমিকদের সহায়তার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশের রাজনৈতিক নেতারাও কার্নি সরকারের কঠোর অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
USMCA চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন
নতুন শুল্ক সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্য কাঠামোর ওপর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে থাকা USMCA বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে চলমান টানাপোড়েন শুধু কয়েকটি পণ্যের ওপর শুল্কের বিষয় নয়; এটি উত্তর আমেরিকার কয়েক দশকের গভীর অর্থনৈতিক সংযোগকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশেষ করে গাড়ি, কৃষি, ইস্পাত ও প্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সরবরাহব্যবস্থা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
সামনে কী?
২২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর ২৩ আগস্ট পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে। আপাতত কানাডার পাল্টা শুল্ক ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে আগামী দুই সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে নতুন কোনো সমঝোতা হয় কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কানাডা বলছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায় না; বরং ন্যায্য বাণিজ্য চুক্তির জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে দেশটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রয়োজন হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এখন পর্যন্ত নতুন আলোচনার দরজা পুরোপুরি খুলে দেয়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। শুল্কের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে গিয়ে থামে, নাকি আরও বড় বাণিজ্যযুদ্ধে পরিণত হয়—তার উত্তর মিলতে পারে আগামী কয়েক সপ্তাহেই।
