অ্যান্টার্কটিকার বরফশীতল ওয়েডেল সাগরের প্রায় ১০ হাজার ফুট গভীরে খুঁজে পাওয়া গেছে ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত জাহাজ ‘এন্ডুরেন্স’। ১৯১৫ সালে ভয়াবহ বরফচাপে চূর্ণ হয়ে ডুবে যাওয়া জাহাজটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় সাগরের তলদেশে পড়ে ছিল। অথচ বিস্ময়করভাবে এর কাঠের কাঠামো, পেছনের দিকে খোদাই করা নাম এবং জাহাজের প্রতীক এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
২০২২ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক একটি অনুসন্ধানী দল জাহাজটির ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করে। আধুনিক পানির নিচের অনুসন্ধানযান ও ক্যামেরার সাহায্যে তোলা ছবিতে দেখা যায়, এন্ডুরেন্স সমুদ্রতলে সোজা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজটির কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সামগ্রিক কাঠামো আশ্চর্যজনকভাবে ভালো রয়েছে। আবিষ্কারটি শুধু সামুদ্রিক প্রত্নতত্ত্বের জন্য নয়, মানুষের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ইতিহাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বরফের চাপে ডুবে গিয়েছিল ঐতিহাসিক জাহাজ
এন্ডুরেন্স ছিল ব্রিটিশ মেরু অভিযাত্রী স্যার আর্নেস্ট শ্যাকলটনের নেতৃত্বাধীন ইম্পেরিয়াল ট্রান্স-অ্যান্টার্কটিক অভিযানের প্রধান জাহাজ। অভিযানের লক্ষ্য ছিল অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ পাড়ি দিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছানো। ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া এই অভিযানে জাহাজটি দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি অঞ্চলের বিপজ্জনক বরফাচ্ছন্ন জলপথে প্রবেশ করে।
কিন্তু ওয়েডেল সাগরে ঘন সামুদ্রিক বরফের মধ্যে আটকে পড়ে এন্ডুরেন্স। দীর্ঘদিন বরফের চাপে আটকে থাকার পর জাহাজের কাঠের কাঠামো ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৯১৫ সালের ২১ নভেম্বর জাহাজটি ডুবে যায়। অভিযাত্রীদের সামনে তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেদের জীবন বাঁচিয়ে সভ্যতার কাছে ফিরে যাওয়া।
জাহাজ হারালেও শ্যাকলটন তাঁর দলের সদস্যদের বাঁচানোর চেষ্টা ছাড়েননি। বরফের ওপর অস্থায়ী শিবির তৈরি করে তাঁরা অপেক্ষা করেন। পরে ছোট নৌকায় করে পৌঁছান জনমানবহীন এলিফ্যান্ট দ্বীপে। সেখান থেকে শ্যাকলটন কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ জর্জিয়া দ্বীপে পৌঁছান, যাতে উদ্ধার অভিযান সংগঠিত করা যায়।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর এন্ডুরেন্সের অভিযানে অংশ নেওয়া ২৮ জনের সবাই জীবিত ফিরে আসেন। জাহাজটির ধ্বংসের ঘটনা তাই শুধু একটি ব্যর্থ অভিযানের ইতিহাস নয়; বরং নেতৃত্ব, সাহস ও দলগত প্রচেষ্টার এক অসাধারণ কাহিনি।
১০ হাজার ফুট গভীরে যেভাবে মিলল জাহাজের সন্ধান
এন্ডুরেন্সের অবস্থান শনাক্ত করার জন্য বহু বছর ধরে অনুসন্ধানের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ২০২২ সালে ‘এন্ডুরেন্স২২’ নামে একটি আন্তর্জাতিক অভিযান দক্ষিণ আফ্রিকার গবেষণা ও মেরু-সহায়ক জাহাজ এসএ আগুলহাস টু নিয়ে অ্যান্টার্কটিকার উদ্দেশে যাত্রা করে।
অনুসন্ধানকারীরা ব্যবহার করেন উন্নতমানের স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান, যা সমুদ্রের তলদেশে চলাচল করে ছবি ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বরফে ঢাকা দুর্গম অঞ্চলে কাজ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। আবহাওয়া, সামুদ্রিক বরফের গতিবিধি এবং সীমিত দৃশ্যমানতা অনুসন্ধানকে আরও জটিল করে তুলেছিল।
২০২২ সালের ৫ মার্চ, শ্যাকলটনের মৃত্যুর ঠিক ১০০ বছর পর তাঁর জাহাজের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩ হাজার ৮ মিটার গভীরে থাকা জাহাজটি ক্যাপ্টেন ফ্র্যাঙ্ক ওয়ারসলির নথিভুক্ত ডুবে যাওয়ার অবস্থান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ছিল।
অনুসন্ধানকারীরা জাহাজটিকে শনাক্ত করার পর এর বিভিন্ন অংশের ছবি, ভিডিও এবং ত্রিমাত্রিক তথ্য সংগ্রহ করেন। এতে জাহাজের কাঠামো, পেছনের অংশ, জানালা, চাকার অবস্থান এবং নামের খোদাই বিস্তারিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
নাম ও প্রতীক এখনো স্পষ্ট, কাঠের কাঠামোও টিকে আছে
এন্ডুরেন্সের ধ্বংসাবশেষের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পেছনের অংশে থাকা ‘এন্ডুরেন্স’ নামের খোদাই। জাহাজটির নামের নিচে পাঁচটি শীর্ষবিশিষ্ট তারার প্রতীকও দেখা যায়। এই প্রতীকটি উত্তর আকাশের ধ্রুবতারার সঙ্গে সম্পর্কিত।
জাহাজটির স্টিয়ারিং হুইল বা দিকনিয়ন্ত্রণের চাকাটিও নিজের অবস্থানে টিকে রয়েছে। কাঠের বিভিন্ন অংশ, কাঠামোগত সংযোগ এবং বাইরের আবরণে সময়ের ছাপ থাকলেও অনেক বৈশিষ্ট্য এখনো চেনা যায়। তবে জাহাজটি সম্পূর্ণ অক্ষত নয়; কিছু অংশে ক্ষতি রয়েছে।
গবেষকদের মতে, অ্যান্টার্কটিকার অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশ এবং দুর্গম সমুদ্রতল জাহাজটির কাঠামো দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকতে সাহায্য করেছে। তুলনামূলক উষ্ণ সমুদ্রে কাঠের জাহাজের অবশেষ দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে। কিন্তু এন্ডুরেন্সের ক্ষেত্রে পরিবেশগত পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।
জাহাজটি উদ্ধার নয়, সংরক্ষণই প্রধান লক্ষ্য
এন্ডুরেন্সের সন্ধান পাওয়া গেলেও জাহাজটিকে সমুদ্রের তলদেশ থেকে তুলে আনার পরিকল্পনা করা হয়নি। অ্যান্টার্কটিক চুক্তির আওতায় ধ্বংসাবশেষটি ঐতিহাসিক স্থান ও স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে সুরক্ষিত। ফলে অনুসন্ধানকারীদের জাহাজটিকে স্পর্শ না করে পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধ করতে হয়েছে।
এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাহাজটিকে সরানোর চেষ্টা করলে এর শতাব্দীপ্রাচীন কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বরং পানির নিচে তোলা ছবি, ভিডিও ও ত্রিমাত্রিক নকশার মাধ্যমে গবেষকেরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করছেন।
এন্ডুরেন্সের আবিষ্কার প্রমাণ করেছে, আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম স্থানগুলোর মধ্যেও ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া নিদর্শন খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবে জাহাজটির সংরক্ষণ নিয়ে নতুন উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঐতিহাসিক জাহাজটির ঝুঁকি
২০২৬ সালে এন্ডুরেন্সের সংরক্ষণ নিয়ে নতুন উদ্বেগ সামনে এসেছে। অ্যান্টার্কটিকার সামুদ্রিক বরফ কমে যাওয়া এবং জাহাজ চলাচলের সুযোগ বাড়ার ফলে ঐতিহাসিক স্থানটিতে মানুষের প্রবেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা আরও সতর্ক করেছেন, জাহাজের কাঠ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন সামুদ্রিক প্রাণীর উপস্থিতিও ভবিষ্যতে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
জাহাজটির সুরক্ষায় যুক্তরাজ্যের অ্যান্টার্কটিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংস্থা বিশেষভাবে সুরক্ষিত সামুদ্রিক এলাকা গঠনের উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছে। তবে এ ধরনের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও অনুমোদন প্রয়োজন।
এন্ডুরেন্সের গল্প আজও মানুষকে আকৃষ্ট করে, কারণ এটি একই সঙ্গে এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়, অসাধারণ উদ্ধার অভিযান এবং মানুষের টিকে থাকার প্রতীক। বরফশীতল সমুদ্রের গভীরে পড়ে থাকা জাহাজটি অতীতের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে সামনে এনেছে। এখন বিজ্ঞানী ও সংরক্ষণবিদদের লক্ষ্য হলো, এই অমূল্য ঐতিহাসিক নিদর্শন যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অক্ষত থাকে।
