প্রাচীন মিসরের এক তরুণ ফারাওয়ের সমাধি খুলতেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের সামনে উন্মোচিত হয়েছিল হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। সোনার মুখোশ, অলংকার, রথ, রাজসিংহাসন, মূল্যবান আসবাব, অস্ত্র এবং পরকালীন জীবনের জন্য সাজিয়ে রাখা অসংখ্য সামগ্রী—সব মিলিয়ে আবিষ্কৃত হয়েছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রত্নবস্তু। সেই ফারাও তুতেনখামেন। ১৯২২ সালে তাঁর সমাধি আবিষ্কার আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন: তুতেনখামেনের সমাধি কোনো পিরামিডের ভেতরে ছিল না। তাঁর সমাধি পাওয়া যায় মিসরের রাজাদের উপত্যকা বা ভ্যালি অব দ্য কিংস এলাকায়, পাথুরে পাহাড়ের নিচে খোদাই করা একটি সমাধিতে। সমাধিটির বিশেষত্ব ছিল, বহু মূল্যবান সামগ্রী সেখানে তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল।
কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল সমাধি?
ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার বহু বছর ধরে তুতেনখামেনের সমাধির সন্ধান করছিলেন। ১৯২২ সালের ৪ নভেম্বর তাঁর দল মাটির নিচে নামা সিঁড়ির প্রথম ধাপ খুঁজে পায়। পরবর্তী কয়েক দিনের খননে সামনে আসে বন্ধ দরজা ও সিলমোহরযুক্ত প্রবেশপথ।
কার্টার ও তাঁর দল বুঝতে পারেন, তাঁরা সম্ভবত এমন একটি সমাধি খুঁজে পেয়েছেন, যা প্রাচীনকাল থেকে অনেকাংশে অক্ষত রয়েছে। ২৬ নভেম্বর একটি ছোট ছিদ্র দিয়ে ভেতরে আলো ফেলতেই দেখা যায় সোনা, আসবাব, মূর্তি ও নানা মূল্যবান সামগ্রীতে ভরা অন্ধকার কক্ষ।
সমাধির ভেতরে প্রবেশের পর প্রত্নতাত্ত্বিকদের বুঝতে হয়, এত বিপুলসংখ্যক বস্তু একসঙ্গে সরানো, নথিবদ্ধ করা এবং সংরক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। ফলে আবিষ্কারের পরপরই সবকিছু বের করে নেওয়া হয়নি; প্রতিটি বস্তু সাবধানে পরীক্ষা ও তালিকাভুক্ত করা হয়।
সোনার মুখোশ ও তিনটি কফিন
তুতেনখামেনের সমাধির সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন তাঁর সোনার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মুখোশ। তরুণ ফারাওয়ের মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলা এই মুখোশে সোনা ও মূল্যবান পাথরের ব্যবহার রয়েছে। এটি প্রাচীন মিসরের শিল্পকলা ও রাজকীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অন্যতম পরিচিত প্রতীক।
তবে মুখোশটি পাওয়া ছিল দীর্ঘ প্রক্রিয়ার শেষের দিকের ঘটনা। সমাধির মূল কক্ষে পাথরের একটি বিশাল সারকোফেগাসের ভেতরে রাখা ছিল তিনটি কফিন—একটির ভেতরে আরেকটি। বাইরের দুটি কফিন কাঠের ওপর সোনার আবরণ ও মূল্যবান পাথরের অলংকরণে তৈরি। সবচেয়ে ভেতরের কফিনটি ছিল খাঁটি সোনার তৈরি।
মমির মাথা ও কাঁধের ওপর রাখা ছিল বিখ্যাত সোনার মুখোশটি। মমির ব্যান্ডেজের মধ্যেও পাওয়া যায় বিভিন্ন তাবিজ, আংটি, ব্রেসলেট ও অন্যান্য অলংকার। প্রাচীন মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরের জীবনে যাত্রার সময় এসব সামগ্রী মৃত রাজাকে সুরক্ষা দেবে।
রথ, সিংহাসন ও রাজকীয় আসবাব
সমাধির অন্য কক্ষগুলোতে পাওয়া যায় সোনার আবরণ দেওয়া রথ, অলংকৃত চেয়ার, বিছানা, বাক্স, সিন্দুক এবং রাজকীয় সিংহাসন। কিছু রথ খুলে বা আলাদা অংশে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল, সম্ভবত ছোট জায়গায় বেশি সামগ্রী রাখার প্রয়োজনেই।
একটি বিশেষ সিংহাসনে তুতেনখামেন ও তাঁর স্ত্রী আনখেসেনামুনের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এতে সোনা, রুপা এবং রঙিন অলংকরণ ব্যবহৃত হয়েছে। এই ধরনের নিদর্শন শুধু রাজপরিবারের সম্পদই নয়, সে সময়ের শিল্পী ও কারিগরদের দক্ষতারও প্রমাণ।
সামগ্রীগুলোর মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের আসবাব, প্রসাধনসামগ্রী, পোশাক, অলংকার এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের জিনিস। এসব বস্তু থেকে বোঝা যায়, রাজকীয় জীবনযাত্রায় সৌন্দর্য, আরাম ও ধর্মীয় বিশ্বাস কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
পরকালের জন্য খাবার, খেলনা ও ধর্মীয় সামগ্রী
প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরও মানুষের অস্তিত্বের একটি রূপ থাকে। তাই মৃত ব্যক্তির সমাধিতে এমন জিনিস রাখা হতো, যা পরকালে কাজে লাগবে বলে মনে করা হতো।
তুতেনখামেনের সমাধিতে পাওয়া যায় খাদ্যদ্রব্যের পাত্র, মদ রাখার জার, ঝুড়ি, বোর্ড গেম, মডেল নৌকা, মূর্তি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সামগ্রী। এসবের পাশাপাশি ছিল জুতা, স্যান্ডেল, হাঁটার লাঠি এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের আরও নানা বস্তু।
সমাধির একটি কক্ষে পাওয়া যায় বিশেষভাবে সাজানো ধর্মীয় কাঠামো, যার ভেতরে ছিল ফারাওয়ের দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ সংরক্ষণের পাত্র। মমি তৈরির সময় এসব অঙ্গ আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হতো। পাত্রগুলোর সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত ছিল বিভিন্ন দেবীর প্রতীকী মূর্তি।
কেন এত বিখ্যাত হয়ে উঠল এই সমাধি?
তুতেনখামেন খুব দীর্ঘ সময় শাসন করেননি। অল্প বয়সে সিংহাসনে বসা এই ফারাও প্রায় ১৮ বছর বয়সে মারা যান বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীন মিসরের অন্য অনেক শাসকের তুলনায় তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্বও সীমিত ছিল। তবু তাঁর সমাধি আবিষ্কার তাঁকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে।
এর অন্যতম কারণ, সমাধির বিপুলসংখ্যক সামগ্রী তুলনামূলকভাবে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। অন্য অনেক রাজকীয় সমাধি প্রাচীনকালেই লুট হয়ে গিয়েছিল। তুতেনখামেনের সমাধি থেকে পাওয়া বস্তুগুলো তাই প্রাচীন মিসরের রাজকীয় জীবন, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্প ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পর্কে অভূতপূর্ব তথ্য দিয়েছে।
পাঁচ হাজার নিদর্শনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে ইতিহাস
সমাধি থেকে উদ্ধার করা পাঁচ হাজারের বেশি বস্তু নথিবদ্ধ করতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছিল। প্রতিটি নিদর্শন পরীক্ষা, ছবি তোলা, সংরক্ষণ এবং গবেষণার মধ্য দিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
তুতেনখামেনের সমাধি আমাদের জানায়, প্রাচীন মিসরীয়রা মৃত্যুকে কেবল জীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখতেন না; বরং পরকালের যাত্রা হিসেবে কল্পনা করতেন। সোনার মুখোশ থেকে সাধারণ স্যান্ডেল—প্রতিটি বস্তু সেই বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনও তুলে ধরে।
এই কারণেই তুতেনখামেনের সমাধি শুধু গুপ্তধনের গল্প নয়। এটি এমন এক সময়ের দরজা, যার ভেতর দিয়ে কয়েক হাজার বছর আগের মানুষের জীবন, শিল্প, ক্ষমতা ও মৃত্যুচিন্তাকে কাছ থেকে দেখা যায়।
