একসময় মহাকাশকে মনে করা হতো সীমাহীন খালি জায়গা। কিন্তু পৃথিবীর নিচু কক্ষপথ বা Low Earth Orbit (LEO) এখন আর আগের মতো ফাঁকা নেই। হাজার হাজার সক্রিয় স্যাটেলাইট, পুরোনো মহাকাশযানের ধ্বংসাবশেষ এবং বিভিন্ন দেশের নতুন নতুন স্যাটেলাইট নক্ষত্রপুঞ্জ মিলে তৈরি করছে এক অভূতপূর্ব ‘মহাকাশ ট্রাফিক’। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ইলন মাস্কের SpaceX-এর Starlink।
সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, স্যাটেলাইট ও মহাকাশের আবর্জনার ঘনত্ব দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে সংঘর্ষের ঝুঁকি, কক্ষপথ নিয়ন্ত্রণের জটিলতা এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কক্ষপথ ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে বিজ্ঞানী ও মহাকাশ শিল্পে উদ্বেগ বাড়ছে।
Starlink মূলত স্যাটেলাইটের বিশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার জন্য তৈরি। প্রচলিত বড় যোগাযোগ স্যাটেলাইটের তুলনায় এগুলো পৃথিবীর অনেক কাছাকাছি কক্ষপথে থাকে। ফলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট মোতায়েন করে বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
কিন্তু সুবিধার সঙ্গে এসেছে নতুন ঝুঁকিও।
SpaceX ইতোমধ্যে হাজার হাজার Starlink স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠিয়েছে এবং আরও বড় নক্ষত্রপুঞ্জ তৈরির পরিকল্পনা করছে। একই সঙ্গে Amazon, চীনা কোম্পানি, বিভিন্ন সরকার ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও নিজেদের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। ফলে LEO-তে ভবিষ্যতে বস্তুসংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সমস্যা শুধু সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা নয়। কোনো স্যাটেলাইট অচল হয়ে গেলে সেটিও কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। আবার পুরোনো রকেটের অংশ, ভাঙা স্যাটেলাইট এবং ছোট ছোট ধাতব টুকরোও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। কারণ মহাকাশে এসব বস্তু অত্যন্ত বেশি গতিতে চলাচল করে। ছোট একটি টুকরোও একটি কার্যকর স্যাটেলাইটকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই ঝুঁকিকে অনেক সময় ‘Kessler Syndrome’-এর সম্ভাবনার সঙ্গে তুলনা করা হয়—যেখানে একটি সংঘর্ষের ফলে তৈরি ধ্বংসাবশেষ আরও সংঘর্ষ ঘটিয়ে ধীরে ধীরে কক্ষপথের একটি অঞ্চলকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। যদিও এমন বিপর্যয় অনিবার্য নয়, ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও বাড়ছে।
Starlink-এর নিজস্ব স্যাটেলাইটগুলো অবশ্য নিয়মিতভাবে কক্ষপথ পরিবর্তন করে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে পারে। কিন্তু মহাকাশে একই সময়ে হাজার হাজার বস্তু চলাচল করলে প্রতিটি সম্ভাব্য সংঘর্ষের পূর্বাভাস ও সমন্বয় করা ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও কক্ষপথের অর্থনৈতিক ব্যবহার এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, সবচেয়ে আকর্ষণীয় কক্ষপথগুলোতে স্যাটেলাইটের ঘনত্ব বাড়ছে এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে।
তবে বিষয়টির আরেকটি মাত্রা আছে—মহাকাশ এখন কেবল বাণিজ্যিক ক্ষেত্র নয়, সামরিক ক্ষেত্রও।
যোগাযোগ, নেভিগেশন, গোয়েন্দা তথ্য, ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন পরিচালনার মতো কাজে স্যাটেলাইটের গুরুত্ব দ্রুত বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই এমন প্রযুক্তি উন্নত করছে যা অন্য স্যাটেলাইটকে পর্যবেক্ষণ, বাধাগ্রস্ত বা অক্ষম করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। ফলে মহাকাশের ভিড় শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি নয়, সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
এদিকে ইউরোপও Starlink-এর বিকল্প হিসেবে নিজেদের স্যাটেলাইট সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। OneWeb-এর মতো নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যতের Iris² প্রকল্পকে ঘিরে ইউরোপীয় মহাকাশনীতিতে নতুন গতি এসেছে।
সব মিলিয়ে মহাকাশে এখন এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলছে। একদিকে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও নতুন প্রযুক্তির জন্য স্যাটেলাইট প্রয়োজন, অন্যদিকে একই কক্ষপথে অতিরিক্ত ভিড় ভবিষ্যৎ মহাকাশ কার্যক্রমের নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—মহাকাশ কোনো একক দেশের সম্পত্তি নয়। তাই একটি কোম্পানি বা একটি দেশ যত বেশি স্যাটেলাইট পাঠাবে, তার প্রভাব পড়বে সবার ওপর।
পৃথিবীর আকাশের ওপরে তাই নতুন এক ‘ট্রাফিক আইন’ তৈরির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে—কারণ মহাকাশে একটি সংঘর্ষের ধাক্কা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর যোগাযোগ, অর্থনীতি এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও পৌঁছে যেতে পারে।
