মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে বিস্ফোরক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক মন্তব্য। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীকে তিনি এখন ‘আমেরিকান ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখছেন বলে জানিয়েছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই বক্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দক্ষিণ ক্যারোলিনায় এক নির্বাচনী সমাবেশে শুক্রবার ট্রাম্প বলেন, “আমি এখন হরমুজ প্রণালীকে আমেরিকান ভূখণ্ড হিসেবে দেখি।” এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর হরমুজ প্রণালীকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা বিবেচনা করছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের কয়েক দিন আগেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছিলেন। সেই মানচিত্রে প্রণালীটিকে লেখা হয়েছিল—‘New U.S. Territory’। এর মাধ্যমে তিনি শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিতই দেননি, বরং জলপথটির ওপর মার্কিন সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও সামনে এনেছেন।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী?
হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ পরিবহন হয়। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যেত।
ফলে প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তেলের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে জলপথটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের “total control” রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, জলপথটি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করলে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানের জাহাজ ও বন্দরকে ঘিরে সামরিক অবরোধও বজায় রেখেছে।
ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি এর আগে ট্রাম্পের হরমুজ দখলের বক্তব্যকে ‘কল্পনাপ্রসূত বিভ্রম’ হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর বক্তব্য, হরমুজ প্রণালী ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ভবিষ্যতেও ইরানেরই থাকবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন দাবি জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি—রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব—ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা। তিনি এটিকে পুরোনো ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি হিসেবেও দেখেছেন।
তেলবাজারে নতুন আতঙ্ক
হরমুজ প্রণালী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বিরোধ যত বাড়ছে, ততই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। এই জলপথ দীর্ঘ সময় কার্যত বন্ধ বা সীমিত থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি, পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে।
বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো এ পরিস্থিতিতে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর তাদের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য। চীনও ইরানের তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান ক্রেতা হওয়ায় ওয়াশিংটনের নতুন নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ সংকটের প্রভাব বেইজিংয়ের ওপরও পড়তে পারে।
সামনে কী হতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ট্রাম্পের ‘আমেরিকান ভূখণ্ড’ মন্তব্য বাস্তবে কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপে রূপ নেবে কি না। আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এমন পদক্ষেপ অত্যন্ত বিতর্কিত হবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী ঘিরে মার্কিন ও ইরানি সামরিক উপস্থিতি বাড়লে ভুল বোঝাবুঝি বা সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং সমঝোতার প্রচেষ্টা এখনও অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর ইরানও সেগুলো প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
ফলে ট্রাম্পের হরমুজকে ‘আমেরিকান ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখার ঘোষণা শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে—এখন সেটিই আন্তর্জাতিক মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
