দীর্ঘ কয়েক বছর পর আবারও অং সান সু কির দেখা মিলেছে। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রকাশ করা বিরল কিছু ছবিতে দেশটির ক্ষমতাচ্যুত নেত্রীকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের এক প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে তার অবস্থান ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের মধ্যে এই ছবি প্রকাশ্যে আসায় বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত ৩ আগস্ট মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) একজন প্রতিনিধি অং সান সু কির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আইসিআরসি জানিয়েছে, তাদের প্রতিনিধি সু কির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। সংস্থাটির নিয়ম অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে এ ধরনের সাক্ষাতে তাদের কল্যাণ ও মানবিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ থাকে। তবে সাক্ষাতে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি আইসিআরসি।
প্রকাশিত ছবিগুলোতে ৮১ বছর বয়সী সু কিকে তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায়। একটি ছবিতে তাকে রেড ক্রসের প্রতিনিধির সঙ্গে হাত মেলাতে দেখা গেছে। অন্য একটি ছবিতে তার সামনে জন্মদিনের কেকও দেখা যায়। সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি। ফলে নতুন ছবিগুলো তার জীবিত থাকার পাশাপাশি বর্তমান অবস্থারও একটি বিরল দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু কির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়। এরপর তাকে আটক করে একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, উসকানি এবং অন্যান্য অভিযোগে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সামরিক সরকার কয়েক দফায় তার সাজা কমায় এবং চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে তাকে কারাগারের পরিবর্তে একটি নির্ধারিত বাসভবনে রাখার কথা জানায়।

তবে কারাগার বা নির্ধারিত বাসভবনে থাকার সময় তার সঙ্গে পরিবারের সদস্য ও বাইরের বিশ্বের যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। তার ছেলে কিম অ্যারিসও দীর্ঘদিন ধরে মায়ের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে না পারার কথা জানিয়েছেন। এমনকি গত বছরের শেষ দিকে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে তার মা হয়তো আর বেঁচে নেই। এ কারণে নতুন ছবিতে সু কিকে জীবিত অবস্থায় দেখা যাওয়ার বিষয়টি তার পরিবার ও সমর্থকদের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
অং সান সু কির সঙ্গে রেড ক্রসের এই সাক্ষাৎ এমন এক সময়ে হলো, যখন মিয়ানমারের সামরিক সরকার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে নানা কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটির সামরিক সরকারের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সু কির সঙ্গে বিদেশি প্রতিনিধির সাক্ষাৎ এবং তার ছবি প্রকাশ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে সামরিক সরকারের ভাবমূর্তি উন্নত করার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে। তবে এটি দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে অং সান সু কির মুক্তির দাবিও নতুন করে জোরালো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও আসিয়ান চলতি মাসে তার এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দির নিঃশর্ত মুক্তির আহ্বান জানিয়েছে। তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, মুক্তির বিষয়টি দেশটির আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ফলে বিরল এই সাক্ষাৎ ও ছবি প্রকাশের পরও সু কির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
দীর্ঘ নীরবতার পর অং সান সু কির দেখা পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তার বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেলেও, তিনি কবে পুরোপুরি মুক্তি পাবেন কিংবা মিয়ানমারের রাজনীতিতে তার কোনো ভূমিকা থাকবে কি না—সেসব প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন। তবে সাম্প্রতিক এই ছবি অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত করেছে—দীর্ঘ সময় পর বিশ্বের সামনে আবারও জীবিত অবস্থায় দেখা গেল মিয়ানমারের অন্যতম পরিচিত গণতন্ত্রপন্থী নেত্রীকে।
