দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে চীনের তৈরি যুদ্ধবিমান, সমুদ্রপথে বন্দর ও অবকাঠামো, আর কূটনীতির মঞ্চে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বিস্তার—সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারিত্ব এবং বাংলাদেশের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার অগ্রগতি দেখাচ্ছে, বেইজিংয়ের প্রভাব শুধু কূটনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তা গভীর হচ্ছে।
বাংলাদেশ সম্প্রতি চীনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে এনেছে। বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি আক্রমণকারী হেলিকপ্টার, পরিবহন হেলিকপ্টার ও চালকবিহীন বিমান ব্যবস্থাও প্রস্তাবের অংশ।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের ব্যবহৃত জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা বাংলাদেশি নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলে সরকারি সূত্রে উঠে এসেছে। ফলে চীনা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে নয়, সামরিক সক্ষমতার মূল্যায়নের সঙ্গেও যুক্ত।
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব আরও পুরোনো এবং গভীর। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫ বছর পূর্তিতে ২০২৬ সালে বেইজিং ও ইসলামাবাদ তাদের ‘সর্বকালীন কৌশলগত সহযোগিতা’ আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছে। প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর—সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনীতি ও নিরাপত্তার সমন্বয়। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের দ্বিতীয় পর্যায়ে অবকাঠামো ও যোগাযোগের পাশাপাশি গওয়াদর বন্দরকে আঞ্চলিক সংযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশ সামরিক ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা আরও বাড়ানোর কথাও বলেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা। ২০২৬ সালের সম্মেলনে চীন, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, ইরান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো একই বহুপাক্ষিক মঞ্চে বসেছে। সংগঠনটি কোনো সামরিক জোট নয়, কিন্তু নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে এর গুরুত্ব বাড়ছে।
পাকিস্তানের জন্য সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি সংগঠনের সদস্য এবং ২০২৬-২৭ মেয়াদে বিভিন্ন নেতৃত্বের দায়িত্ব পাওয়ার পথে রয়েছে। পাকিস্তানের সরকারি ব্যাখ্যায়, এই প্ল্যাটফর্ম তাকে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থল হিসেবে নিজের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—চীনের প্রভাব বাড়লেও দক্ষিণ এশিয়ায় বেইজিং সবকিছু নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্ত ও কৌশলগত বিরোধ রয়েছে। ভারত আবার সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সদস্য হয়েও এই মঞ্চকে চীনের একক প্রভাবের বাইরে রেখে মধ্য এশিয়ায় নিজের অবস্থান বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক ছোট দেশগুলোর ক্ষেত্রেও চীনের কৌশল বদলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং শুধু পাকিস্তানের মতো ঐতিহ্যগত ঘনিষ্ঠ অংশীদারের ওপর নির্ভর করছে না; দক্ষিণ এশিয়ার ছোট প্রতিবেশীদের সঙ্গেও অর্থনীতি, অবকাঠামো ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোতে নিজের অবস্থান শক্ত করছে। তবে এসব দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও জাতীয় স্বার্থের কারণে চীনের প্রভাব সর্বত্র একই রকম নয়।
বাংলাদেশের জে-১০সিই আগ্রহ তাই আলাদা একটি সামরিক ক্রয় হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ—যেখানে চীনা অস্ত্র, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতি একই সঙ্গে কাজ করছে।
তবে এর অর্থ দক্ষিণ এশিয়া পুরোপুরি চীনের বলয়ে চলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তও অতিরঞ্জিত হবে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশ ও ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে এই অঞ্চলের দেশগুলোর আলাদা সম্পর্ক রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোও নিজেদের স্বার্থে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে।
তারপরও একটি বিষয় পরিষ্কার: চীনের প্রভাব এখন শুধু সীমান্তের ওপারে থাকা একটি বড় অর্থনীতির প্রভাব নয়; প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি থেকে বন্দর, বাণিজ্য থেকে কূটনৈতিক মঞ্চ—দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত কাঠামোর একাধিক স্তরে বেইজিংয়ের উপস্থিতি ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
