২০২১ সালের আগস্ট। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আফগানিস্তানের একের পর এক শহর তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্ট তালেবান বাহিনী রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করে। প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে চলে যান এবং দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ করে।
এর পাঁচ বছর পর, ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট, আবারও সেই ঘটনার বার্ষিকী সামনে এসেছে। কিন্তু পাঁচ বছর পরের আফগানিস্তানের চিত্র একেবারেই একরৈখিক নয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হলেও অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বেকারত্ব, মানবিক সংকট এবং বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অধিকার নিয়ে পরিস্থিতি এখনো গভীর উদ্বেগের।
তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর আফগানিস্তানের অনেক এলাকায় দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও সংঘাতের মাত্রা কমেছে। রাজধানী কাবুলসহ বিভিন্ন অঞ্চলের বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, আগের তুলনায় রাস্তাঘাটে নিরাপত্তা বেড়েছে এবং যুদ্ধের ভয় কমেছে। এই বিষয়টিকে তালেবান প্রশাসন নিজেদের অন্যতম সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু নিরাপত্তার উন্নতির পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার বড় সংকট রয়ে গেছে।
বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে। মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর শিক্ষা বন্ধ রাখার নীতি এখনো বহাল রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক আফগান কিশোরী মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
নারীদের কর্মক্ষেত্র, চলাচল ও জনজীবনে অংশগ্রহণের ওপরও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব নীতির তীব্র সমালোচনা করে আসছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে প্রায় ২৪ লাখ মেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার বাইরে রয়েছে। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্কুল বয়সী শিশুদের একটি বড় অংশও স্কুলের বাইরে রয়েছে। দীর্ঘদিনের সংঘাত, দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
অর্থনীতিও এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ রয়েছে। খাদ্য, কাজ ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ। বার্ষিকীর ঠিক আগে আফগানিস্তানে নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের ছয় কর্মীকে তালেবান কর্তৃপক্ষ আটক করেছে বলে Human Rights Watch জানিয়েছে। তাঁদের পরিবারকে আটকের কারণ বা অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে তালেবান প্রশাসনের জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতিও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বার্ষিকীর আগে বাদাখশান প্রদেশে তালেবান প্রশাসনের দুই কর্মকর্তাকে পৃথক হামলায় হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ফয়জাবাদের মেয়র হাবিব উর রহমান মনসুর গাড়িতে বিস্ফোরণে নিহত হন। এর আগে প্রদেশটির তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের পরিচালকও হামলায় নিহত হয়েছিলেন।
তালেবান সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। মানবাধিকার, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের অধিকার নিয়ে অবস্থান পরিবর্তন না করলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আরও কঠিন হতে পারে।
তালেবান অবশ্য নিজেদের শাসনব্যবস্থাকে স্থিতিশীল ও নিরাপদ আফগানিস্তান তৈরির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে। তাদের দাবি, যুদ্ধের অবসান এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বড় অর্জন।
কিন্তু পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানের বাস্তবতা যেন দুই বিপরীত ছবিকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে—একদিকে যুদ্ধের ভয় কমেছে, অন্যদিকে স্বাধীনতা ও সুযোগের পরিধিও সংকুচিত হয়েছে।
১৫ আগস্টের পঞ্চম বার্ষিকী তাই শুধু তালেবানের ক্ষমতা দখলের স্মরণ নয়। এটি এমন একটি দেশের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকানোর সুযোগ, যেখানে নিরাপত্তা কিছু মানুষের কাছে বেড়েছে, কিন্তু নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান, মানবাধিকার ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।
পাঁচ বছর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই হলো—তালেবান কি শুধু আফগানিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি দেশটির কোটি মানুষের জন্য একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎও তৈরি করতে পারছে? সময়ই তার উত্তর দেবে।
