পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের কারাবন্দি জীবন নিয়ে এবার সরব হলেন তাঁর দুই ছেলে সুলেমান খান ও কাসিম খান। ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম স্কাই স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁরা বাবার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন তাঁরা।
২৭ আগস্ট ২০২৬ লর্ডসে ইংল্যান্ড-পাকিস্তান টেস্ট চলাকালে সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক ও ধারাভাষ্যকার মাইক অ্যাথারটনের নেওয়া প্রায় ১৮ মিনিটের সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করে স্কাই স্পোর্টস। সাক্ষাৎকারটি ঘিরে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের আপত্তি এতটাই তীব্র হয় যে, ম্যাচের লাঞ্চ বিরতির পর পাকিস্তান দল মাঠে না ফেরার হুমকি দিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ম্যাচ চালু থাকে।
বাবার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ
সাক্ষাৎকারে সুলেমান ও কাসিম জানান, দীর্ঘদিন ধরে বাবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতে না পারায় তাঁরা উদ্বিগ্ন। আল জাজিরাকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও তাঁরা জানান, মার্চে ঈদুল ফিতরের সময় প্রায় ২০ মিনিট কথা বলার পর তাঁরা বাবার কণ্ঠ আর শুনতে পারেননি।
সুলেমানের দাবি, কারাগারে দীর্ঘ একাকী বন্দিত্ব ইমরান খানের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যরা ইমরানকে দেখে তাঁর মধ্যে অস্থিরতা লক্ষ্য করেছেন।
অন্যদিকে কাসিম বলেন, তাঁর বাবা সাধারণত অত্যন্ত মানসিকভাবে শক্ত একজন মানুষ। কিন্তু কারাগারে তাঁর উদ্বেগ ও শারীরিক সমস্যার খবর তাঁদের জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘স্বাধীন চিকিৎসা চাই’
ইমরান খানের চিকিৎসা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর ছেলেরা। ১৮ আগস্ট পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া, পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং ছেলেদের সঙ্গে সপ্তাহে দুইবার ফোনে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিল বলে আল জাজিরা জানিয়েছে। কিন্তু এরপর তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে না নিয়ে সরকারি হাসপাতালে সংক্ষিপ্ত পরীক্ষা করিয়ে আবার কারাগারে পাঠানো হয়।
সুলেমানের অভিযোগ, তাঁরা বাবার জন্য স্বাধীন ও নিরপেক্ষ চিকিৎসা পরীক্ষা চান, যাতে তাঁর প্রকৃত শারীরিক অবস্থার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। পাকিস্তান সরকার অবশ্য ইমরান খানের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
‘বাবাকে হত্যা করার চেষ্টা হচ্ছে’—অভিযোগ
স্কাই স্পোর্টসের সাক্ষাৎকারে দুই ভাই তাঁদের আশঙ্কা আরও স্পষ্ট করেন। তাঁদের দাবি, কারাগারে ইমরানের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে তাঁর জীবন নিয়েই ভয় তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁদের বক্তব্যকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ক্রিকেট মাঠে পৌঁছে গেল রাজনীতি
ইমরান খান নিজে পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় অধিনায়ক। ১৯৯২ সালে তাঁর নেতৃত্বেই পাকিস্তান প্রথমবার ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে। তাই তাঁর ছেলেদের সাক্ষাৎকার ক্রিকেট সম্প্রচারের সময় প্রচার হওয়ায় বিষয়টি আরও বড় মাত্রা পেয়েছে।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড সাক্ষাৎকারটির সম্প্রচার নিয়ে স্কাই স্পোর্টসের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করেছে। এমনকি পাকিস্তান দলকে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকির কথাও সামনে আসে। তবে শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়েরা মাঠে ফিরে আসেন এবং ম্যাচ চলতে থাকে।
ইমরান খানের দুই ছেলের এই সাক্ষাৎকার তাই শুধু একজন বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের ঘটনা নয়; এটি পাকিস্তানের রাজনীতি, মানবাধিকার এবং ক্রিকেট—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে একই আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক মহলে ইমরানের চিকিৎসা ও কারাবন্দি অবস্থার বিষয়ে নজরদারি আরও বাড়বে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
