আরব সাগরে ভারত ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর দুটি জাহাজের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ঘটনাটির পর ভারত পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিককে তলব করেছে। পাকিস্তানও পাল্টা ভারতের কূটনীতিককে ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন গত বছরের সামরিক সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল।
কীভাবে সংঘর্ষ হলো
১৫ সেপ্টেম্বর উত্তর আরব সাগরে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইন এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি ফ্রন্টলাইন যুদ্ধজাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
ভারতের দাবি, পাকিস্তানি জাহাজটি উচ্চ গতিতে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজের খুব কাছে চলে আসে এবং অনিরাপদভাবে কৌশল পরিবর্তন করতে গিয়ে সংঘর্ষ ঘটায়।
ভারতীয় নৌযানে বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি বলে দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পাকিস্তানি জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বন্দরে ফিরে যায়।
দুই দেশের বক্তব্য এক নয়
ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভারত ও পাকিস্তান সংঘর্ষের স্থান ও দায় নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে।
ভারতের দাবি, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটে এবং পাকিস্তানি নৌযানের আচরণ ছিল অগ্রহণযোগ্য ও পেশাগত মানদণ্ডের বাইরে।
অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, ভারতীয় যুদ্ধজাহাজ তাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল এবং নৌ মহড়ার সময় বিপজ্জনকভাবে কৌশল পরিবর্তন করেছিল।
ফলে ঘটনাটি দুর্ঘটনা, নাকি কোনো পক্ষের সামরিক আচরণের ফল—তা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
১৯৯১ সালের চুক্তির প্রসঙ্গ
ভারত ১৯৯১ সালের একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির কথা উল্লেখ করেছে। চুক্তিতে আন্তর্জাতিক জলসীমায় দুই দেশের সামরিক জাহাজ ও সাবমেরিনের মধ্যে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার বিষয় রয়েছে।
নয়াদিল্লির অভিযোগ, পাকিস্তানি জাহাজের আচরণ ওই ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
পাকিস্তানও পাল্টা আন্তর্জাতিক আইন ও একই ধরনের দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছে।
অর্থাৎ একই চুক্তিকে দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থানের পক্ষে ব্যবহার করছে।
কেন ঘটনাটি এত সংবেদনশীল
ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ রয়েছে এবং অতীতে একাধিক যুদ্ধও হয়েছে।
গত বছর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পর আরব সাগরে যুদ্ধজাহাজের এই সংঘর্ষ তাই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সামরিক জাহাজ সাধারণত অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চলাচল করে। ফলে দুই দেশের নৌবাহিনীর জাহাজের সংঘর্ষ শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে শেষ না হয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়লেও বড় সংঘাতের প্রমাণ নেই
দুই দেশই কূটনীতিক তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ঘটনাটি বড় সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার কোনো তথ্য নেই।
ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের জন্যই সামুদ্রিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আরব সাগর শুধু সামরিক দিক থেকেই নয়, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ লাইন ও বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তায় নিয়মিত টহল দেয়। পাকিস্তানের নৌবাহিনীও নিজেদের সমুদ্রসীমা ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে সক্রিয়।
এই অবস্থায় ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে সামরিক যোগাযোগ, নৌচলাচলবিধি এবং কূটনৈতিক পর্যায়ের আলোচনার গুরুত্ব আরও বাড়বে।
