বছরের পর বছর ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, নিয়ন্ত্রিত এবং ক্যারিশম্যাটিক রাজনৈতিক ইমেজ গড়ে তুলেছেন। বিশাল জনসভা, পরিকল্পিত ভাষণ, রেডিও ও টেলিভিশন বার্তা এবং সুচারুভাবে সাজানো জনসমক্ষে উপস্থিতি—এসবই ছিল তার রাজনৈতিক যোগাযোগের পরিচিত ধরন। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সেই পরিচিত মোদিকেই দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে।
কখনও সেলফি ক্যামেরার সামনে তরুণদের উদ্দেশে বলছেন ‘হাই, ফ্রেন্ডস’, কখনও জনপ্রিয় ‘Get Ready With Me’ বা GRWM ধরনের রিলসের কথা বলছেন। আবার Gen Z-দের পরিচিত অনলাইন ভাষা ও ট্রেন্ডও ব্যবহার করছেন বক্তব্যে। প্রশ্ন উঠছে—দীর্ঘদিনের ‘স্ট্রংম্যান’ ইমেজ গড়ে তোলা ৭৫ বছর বয়সী মোদি হঠাৎ কেন Gen Z-দের ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন?
এর উত্তর খুঁজতে হলে তাকাতে হবে ভারতের সাম্প্রতিক তরুণ আন্দোলন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে।
রাস্তায় নামার আগে আন্দোলন হয়েছিল রিলসে
ভারতে সাম্প্রতিক ছাত্র ও তরুণদের বিক্ষোভ দেখিয়েছে যে, রাজনীতির পুরোনো ডিজিটাল খেলার নিয়ম বদলে যাচ্ছে। পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক, কর্মসংস্থানের সংকট এবং শিক্ষার সুযোগ নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে অনলাইনে। মিম, লাইভস্ট্রিম এবং Instagram Reels-এর মাধ্যমে সেই অসন্তোষ দ্রুত বড় আন্দোলনে রূপ নেয়।
ব্যঙ্গাত্মক ‘Cockroach Janta Party’ বা CJP-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অনলাইন আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এতটাই রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে যে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়। আন্দোলনের শক্তি শুধু রাস্তায় মানুষের উপস্থিতিতে ছিল না; এর বড় অংশ তৈরি হয়েছিল Instagram-এর অ্যালগরিদম, ভাইরাল মিম এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ছোট ভিডিওর মাধ্যমে।
এখানেই সম্ভবত মোদি এবং বিজেপি বুঝতে পারে, তরুণ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের পুরোনো ডিজিটাল পদ্ধতি আর যথেষ্ট নয়।
WhatsApp থেকে Instagram—ডিজিটাল যুদ্ধের মাঠ বদলে গেছে
গত এক দশকে BJP ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী ডিজিটাল রাজনৈতিক নেটওয়ার্কগুলোর একটি গড়ে তুলেছিল। WhatsApp গ্রুপ, Facebook পেজ এবং X-এ সংগঠিত সমর্থক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দলটি নিজেদের বার্তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু Instagram-এর পরিবেশ আলাদা। এখানে শুধু বড় ফলোয়ার সংখ্যা বা সংগঠিত সমর্থক নেটওয়ার্ক সবসময় কাজ করে না। একটি ছোট অ্যাকাউন্টের রিলসও অ্যালগরিদমের মাধ্যমে লাখো বা কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, যদি সেটি যথেষ্ট প্রতিক্রিয়া, শেয়ার, রিপ্লে এবং মন্তব্য তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, BJP-র পুরোনো ডিজিটাল কৌশল ছিল অনেকটাই ‘নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক’; কিন্তু Instagram-এর বর্তমান বাস্তবতা অনেক বেশি আবেগ, বিনোদন, ব্যক্তিত্ব এবং স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ বার্তা নিয়ন্ত্রণের চেয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কেন Gen Z এত গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় Gen Z হবে দেশের অন্যতম বড় ভোটারগোষ্ঠী। ফলে আগামী নির্বাচনের রাজনীতিতে তরুণদের সমর্থন অর্জন করা যে BJP-র জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা স্পষ্ট।
আর এই প্রজন্ম কোথায় সময় কাটায়? উত্তর—মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে।
২০২৬ সালের একটি Meta-সম্পর্কিত গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের Gen Z ব্যবহারকারীদের মধ্যে Reels-এর দৈনিক ব্যবহার অত্যন্ত বেশি এবং ছোট ভিডিও এখন তাদের কনটেন্ট, সংস্কৃতি ও নতুন ধারণা আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে তরুণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে চাইলে Instagram ও Reels এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ক্রমেই কমছে।
‘মিত্রোঁ’ থেকে ‘ফ্রেন্ডস’
মোদির সাম্প্রতিক যোগাযোগ কৌশলের সবচেয়ে লক্ষণীয় পরিবর্তন সম্ভবত ভাষায়। একসময় তার বক্তৃতার পরিচিত শব্দ ছিল ‘মিত্রোঁ’। এখন Instagram-এ তিনি তরুণদের উদ্দেশে অনেক বেশি অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্রেন্ডস’ বলছেন।
তার প্রথম সেলফি ভিডিও অবশ্য প্রত্যাশামতো সাফল্য পায়নি। ভিডিওর ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, আলো এবং ‘ফ্রেন্ডস’ বলার পর বিরতির মতো বিষয় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ব্যঙ্গ ও মিম তৈরি হয়। কিন্তু পরবর্তী ভিডিওগুলোতে তার টিম ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল ও উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনে—যা থেকে বোঝা যায়, তারা সম্ভবত অনলাইন প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে এবং দ্রুত নিজেদের কনটেন্ট বদলাচ্ছে।
শুধু রিলস বানালেই কি মন জয় হবে?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
কিছু তরুণ মোদির এই নতুন যোগাযোগের চেষ্টা ইতিবাচকভাবে দেখলেও অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাদের যুক্তি, Gen Z-এর ভাষা ব্যবহার করলেই Gen Z-এর সমস্যার সমাধান হয় না। চাকরি, শিক্ষা, পরীক্ষার স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের যে উদ্বেগ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, সেগুলোর বাস্তব সমাধান ছাড়া শুধু ট্রেন্ড অনুসরণকে অনেকে রাজনৈতিক ‘মেকওভার’ হিসেবেই দেখছেন।
ভারতের রাজনৈতিক যোগাযোগ এখন তাই এক নতুন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একসময় নেতারা বক্তব্য দিতেন, মানুষ শুনত। এখন মানুষ শুধু শুনছে না—ভিডিও কেটে মিম বানাচ্ছে, মন্তব্য করছে, ব্যঙ্গ করছে এবং নিজেদের বক্তব্যও ভাইরাল করে তুলছে।
নরেন্দ্র মোদির Gen Z রিলস তাই কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর নতুন সোশ্যাল মিডিয়া অভ্যাস নয়। এটি ভারতের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের প্রতীক—যেখানে শক্তিশালী ইমেজ, সংগঠিত ডিজিটাল বাহিনী এবং একমুখী প্রচারের পাশাপাশি এখন লড়াই করতে হচ্ছে অ্যালগরিদম, মিম, ক্যামেরা এবং ১৫ সেকেন্ডের একটি রিলসের সঙ্গেও।
আর ২০২৯ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, এই ‘স্ক্রলিং ভোটারদের’ মন জয়ের লড়াই সম্ভবত ভারতের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে।
