নেপালের ভয়াবহ বন্যার পর নিখোঁজ মানুষের তালিকায় যোগ হয়েছে বহু বিদেশি নাগরিকের নাম। হিমালয়ের এই দুর্গম অঞ্চলে বন্যার সময় বহু পর্যটক ও তীর্থযাত্রী অবস্থান করছিলেন। যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় তাঁদের অবস্থান নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নেপালের বাইরে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
২৬ আগস্টের বন্যায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই রুট দিয়ে অনেক মানুষ তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে যাতায়াত করেন। ফলে দুর্যোগের সময় সেখানে থাকা বিদেশিদের একটি বড় অংশ নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, তাদের অন্তত ৩৪ নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় ছিলেন। অস্ট্রেলীয় সরকার জানিয়েছে, দুর্গত এলাকায় যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তি অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সও জানিয়েছে, বন্যার সময় দুর্গত এলাকায় থাকা ৮০ ফরাসি নাগরিকের মধ্যে ৭৬ জনের সন্ধান পাওয়া গেলেও চারজন এখনো নিখোঁজ। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁদের সন্ধানে কাজ করছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কয়েকজন নাগরিক নিখোঁজ এবং আরও কয়েকজন দুর্গত এলাকায় আটকা পড়েছেন। সিউল উদ্ধার ও ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে এবং মানবিক সহায়তার জন্য অর্থও দেওয়ার ঘোষণা করেছে।
নেপালের জন্য বিদেশিদের উদ্ধার করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ও মানবিক বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন দেশ তাদের উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ সহযোগিতার আগ্রহ জানিয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নেপাল আপাতত বিদেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল গ্রহণের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, নেপালের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলো উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। দক্ষিণ কোরিয়া অবশ্য আলোচনার মাধ্যমে সহযোগিতার সম্ভাবনা বজায় রাখছে।
বিদেশি নাগরিকদের সন্ধানের কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে ধ্বংস হওয়া সড়ক ও সেতু। অনেক এলাকায় মোবাইল যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে পরিবারের সদস্যরা দূর থেকে প্রিয়জনের খবর জানার জন্য অপেক্ষা করছেন।
চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী গিরং বন্দরও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চীনা উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছে দেখতে পায়, পুরো এলাকা প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। রাস্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের পাহাড় ও বন পেরিয়ে দুর্গম পথে যেতে হয়েছে।
এখন নিখোঁজ বিদেশিদের সন্ধান নেপালের উদ্ধার অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবারগুলোর কাছে প্রতিটি ঘণ্টা যেন অনিশ্চয়তায় কাটছে। উদ্ধারকারীদের আশা, দুর্গম এলাকায় আরও জীবিত মানুষ পাওয়া যেতে পারে।
নেপালের বন্যা তাই শুধু একটি দেশের দুর্যোগ হয়ে থাকেনি। হিমালয়ের এই বিপর্যয় এখন বহু দেশের নাগরিকদের জীবন ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে।
