নেপালের ভয়াবহ বন্যা এখন শুধু উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধানের সংকটে সীমাবদ্ধ নেই। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থাও। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের হিসাবে, অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ এই বিপর্যয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং তাঁদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এর মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।
২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যায় নেপালের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হয়। বহু মানুষ নিজেদের বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু বন্যার কারণে যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দুর্যোগে অন্তত ছয়টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি আটজন স্বাস্থ্যকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা প্রয়োজন, সেখানেই চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বন্যার পর স্বাস্থ্যঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে মানুষ যখন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন, তখন সেখানে অতিরিক্ত ভিড়, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে WHO।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বন্যার পানি ও কাদার মধ্যে দীর্ঘসময় আটকে থাকা মানুষের মধ্যে আঘাতজনিত চিকিৎসার প্রয়োজন বাড়বে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ সরবরাহও কঠিন হতে পারে। ফলে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি এখন জরুরি স্বাস্থ্যব্যবস্থা সচল রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ।
রেডক্রসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুর্গত মানুষের জন্য খাদ্য ও পানি পৌঁছে দেওয়া জরুরি। জাতিসংঘের হিসাবেও হাজার হাজার পরিবার খাদ্য সহায়তার প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে অনেক মানুষকে জরুরি পানি ও অন্যান্য সহায়তা দিতে হচ্ছে।
বন্যার আরেকটি বড় সমস্যা হলো যোগাযোগ। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় অনেক দুর্গত এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন। ত্রাণবাহী গাড়ির চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সহায়তা পাঠানো হচ্ছে, কিন্তু পাহাড়ি আবহাওয়া ও নতুন করে বন্যার ঝুঁকির কারণে আকাশপথও সবসময় নিরাপদ নয়।
এদিকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে নতুন জলাধার ও ব্যারিয়ার লেকের আশঙ্কা। একটি জলাধারের পানি বাড়তে থাকায় উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে উদ্ধারকাজ আবার শুরু হয়।
এই পরিস্থিতিতে নেপালের সামনে এখন একসঙ্গে কয়েকটি বড় দায়িত্ব—নিখোঁজদের খোঁজা, আহতদের চিকিৎসা, খাদ্য ও পানি সরবরাহ, বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় এবং রোগের বিস্তার ঠেকানো।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের তাৎক্ষণিক ধাক্কা সামলে উঠলেও এর মানবিক প্রভাব দীর্ঘদিন থাকতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষদের জন্য পুনর্বাসন হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
নেপালের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি বড় মানবিক সংকটের রূপ নিয়েছে। উদ্ধার অভিযান চললেও একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা এবং দুর্গত মানুষকে দ্রুত প্রয়োজনীয় সহায়তার আওতায় আনা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
