নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও হড়পা বানের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মৃতের সংখ্যা ১,১০০ ছাড়িয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সর্বশেষ বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যায় কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। রয়টার্সের ২ সেপ্টেম্বরের আপডেটে নেপালে অন্তত ১,১১৪ জন নিহত এবং প্রায় ৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ থাকার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে নেপালের সর্বশেষ সরকারি তথ্য উদ্ধৃত করে এনডিটিভি ও অন্যান্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা ১,১২৭ এবং নিখোঁজ ৪,৮৫৮ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে মাঠপর্যায়ে শনাক্তকরণ ও হিসাব হালনাগাদের কারণে সংখ্যায় পরিবর্তন হচ্ছে।
২৬ আগস্টের দুর্যোগে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর করিডর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রবল স্রোতের সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে অনেক গ্রাম ও সড়ক কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও নিখোঁজ হয়েছেন। তাদের একটি অংশ সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। বহু সড়ক ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় ভারী উদ্ধারযন্ত্র পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও হেলিকপ্টার, কোথাও সামরিক যান, আবার কোথাও উদ্ধারকারীদের পায়ে হেঁটে এগোতে হচ্ছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, চীনের তিব্বত অংশে ধ্বংসপ্রাপ্ত সড়ক পুনরায় চালু হওয়ায় ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। নেপালেও সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী উদ্ধার তৎপরতা বাড়িয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে। নেপালের পার্বত্য অর্থনীতিতে জলবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাম্প্রতিক দুর্যোগে বেশ কয়েকটি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। সর্বশেষ সরকারি হিসাবগুলোর একটিতে ৫৮৩ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি শুরু হয়েছে মৃতদেহ শনাক্তকরণ। এত বিপুলসংখ্যক মৃতদেহ একসঙ্গে উদ্ধার হওয়ায় হাসপাতাল ও মর্গগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না—এমন মৃতদেহ সংরক্ষণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ কারণে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের নমুনা নিয়ে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। ভারত থেকেও ফরেনসিক ও ডিএনএ বিশেষজ্ঞ দল নেপালকে সহায়তা করছে।
ত্রাণ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। হাজার হাজার মানুষ ঘর হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র, মঠ কিংবা অস্থায়ী শিবিরে অবস্থান করছেন। খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও স্যানিটেশন এখন জরুরি প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় দীর্ঘদিন আটকে থাকা মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই দুর্যোগের পর নেপালের সামনে এখন তিনটি বড় কাজ—নিখোঁজদের সন্ধান, মৃতদের শনাক্তকরণ এবং ধ্বংস হওয়া অবকাঠামো পুনর্গঠন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ কীভাবে ঠেকানো যায়, সেটিও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
নেপালের জন্য এটি এখন শুধু উদ্ধার অভিযান নয়; এটি পরিণত হয়েছে একটি জাতীয় পুনর্গঠন ও মানবিক সংকটে।
