নেপালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত শুকানোর আগেই সামনে এসেছে আরও বড় বিপদের আশঙ্কা। হিমবাহ ও পাহাড়ধসের কারণে তৈরি হওয়া একটি বিশাল অস্থায়ী জলাধার বা ব্যারিয়ার লেকের পানি বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শুক্রবার স্থানীয় কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, জলাধারটির পানি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আবারও নদীগুলোতে ভয়াবহ ঢল নামতে পারে।
২৬ আগস্ট হিমালয় অঞ্চলে বরফ, পাথর ও মাটির বিশাল ধসের পর নদীপথে প্রচণ্ড স্রোত তৈরি হয়। সেই স্রোত রাসুয়া জেলা ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ধসের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে একটি ব্যারিয়ার লেক তৈরি হয়। পরে সেখানে দ্রুত পানি জমতে শুরু করে।
রয়টার্স জানিয়েছে, ২৮ আগস্ট ওই জলাধারের পানি তীর উপচে পড়ার খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ উঁচু এলাকায় সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়। হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযানও কিছু সময়ের জন্য স্থগিত ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু একটি নয়—দুর্যোগকবলিত এলাকায় একাধিক জলাধার ও হিমবাহ-সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় পর্যবেক্ষণ করছে কর্তৃপক্ষ। স্যাটেলাইট ছবিতে একটি জলাধারের আকার বাড়তে দেখা গেছে এবং সেখানে পানি বের হওয়ার সুস্পষ্ট পথ নেই বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় ধসের কারণে নদী আটকে গেলে সেখানে দ্রুত পানি জমে যায়। সেই প্রাকৃতিক বাঁধ কোনো কারণে ভেঙে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এই ধরনের ঘটনাকে ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম আউটবার্স্ট’ বা অনুরূপ আকস্মিক বন্যা হিসেবে দেখা হয়। হিমালয়ের মতো খাড়া ভূপ্রকৃতিতে এর ধ্বংসক্ষমতা ভয়াবহ হতে পারে।
নেপালের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—প্রথম বন্যার ধাক্কায় অনেক সড়ক ও সেতু ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়েছে। উদ্ধারকারী ও ত্রাণবাহী গাড়ির চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দফায় ঢল নামলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস জানিয়েছে, ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছেন।
জাতিসংঘও সতর্ক করেছে, এই দুর্যোগ এখনো শেষ হয়নি। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সংস্থার কর্মকর্তারা ‘ক্যাসকেডিং হ্যাজার্ড’ বা একের পর এক বিপদ তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছেন। অর্থাৎ একটি ধস থেকে বন্যা, বন্যা থেকে নতুন জলাধার, আবার সেই জলাধার ভেঙে নতুন ঢল—এভাবে বিপর্যয় আরও বিস্তৃত হতে পারে।
এদিকে চীনও হিমবাহের হ্রদ, ভূমিধস ও ব্যারিয়ার লেকের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে। চীনা উদ্ধারকারী দল ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্ত এলাকায় পৌঁছে ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র দেখতে পেয়েছে।
ফলে নেপালের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে নিখোঁজদের সন্ধান ও জীবিতদের উদ্ধার, অন্যদিকে নতুন বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা। যতক্ষণ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জলাধারগুলোর পানি নিরাপদভাবে কমছে না, ততক্ষণ দুর্গত এলাকায় আতঙ্ক কাটার সম্ভাবনা কম।
