চারদিকে ধ্বংসস্তূপ। নেই পরিচিত রাস্তা, নেই স্কুলের ভবন, নেই আগের সেই বাজার। কাদা, পাথর আর পানিতে বদলে গেছে পুরো এলাকা। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বেঁচে গেল আট বছরের এক শিশু। গাছে উঠে বন্যার স্রোত থেকে নিজেকে রক্ষা করা সেই শিশুই শেষ পর্যন্ত ফিরে পেল তার মাকে।
নেপালের রাসুয়া জেলার ভয়াবহ বন্যায় বেঁচে যাওয়া জোয়াল ঘালের গল্প এখন মানুষের মনে আশার আলো জাগাচ্ছে। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার সময় সে স্কুলে ছিল। হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে এবং প্রবল স্রোত ও ধ্বংসাবশেষ ছুটে আসে। প্রাণ বাঁচাতে সে একটি জঙ্গলের দিকে দৌড়ে যায় এবং গাছে উঠে আশ্রয় নেয়।
পরদিন উদ্ধারকারীরা তাকে আহত অবস্থায় খুঁজে পান। তার একটি পা ভেঙে গিয়েছিল এবং মুখে ছিল আঘাতের চিহ্ন। পরে তাকে নুওয়াকোটের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু তখনও কেউ জানত না তার পরিবার কোথায়। শিশুটির হাতে ছিল মাত্র ২০ নেপালি রুপি—উদ্ধারকারীরা হাসপাতালে যেতে রাজি করাতে তাকে এই টাকা দিয়েছিলেন।
এদিকে জোয়ালের মা মতি মায়া তামাং একের পর এক আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধার তালিকায় সন্তানদের খুঁজছিলেন। কোথাও দুই ছেলের নাম পাচ্ছিলেন না। একসময় তিনি ধরে নিয়েছিলেন, সন্তানরা হয়তো আর বেঁচে নেই। এমন পরিস্থিতিতে একটি ফোনকল পুরো ঘটনাকে বদলে দেয়।
হাসপাতালে থাকা জোয়ালের সঙ্গে রয়টার্সের সাংবাদিকদের দেখা হয়। সাংবাদিকরা তার পরিবারকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন এবং পরে মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার হাসপাতালে ছেলের সঙ্গে দেখা হয় মতি মায়ার। সন্তানকে জীবিত দেখে তিনি আবেগে ভেঙে পড়েন। তার ছোট ছেলেকেও জীবিত পাওয়া গেছে।
জোয়ালের বেঁচে ফেরার গল্পটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন নেপাল-তিব্বত সীমান্তের বন্যায় শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ। বন্যার স্রোতে পুরো বসতি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। অনেক পরিবার এখনো স্বজনের সন্ধানে অপেক্ষা করছে।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, নেপালের রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিং জেলায় অন্তত ১৭ হাজার শিশু এই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা, নিবন্ধন করা এবং পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন ঘটানো এখন জরুরি কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জোয়ালের মা জানিয়েছেন, বন্যার পর তাঁর পরিচিত এলাকা এতটাই বদলে যায় যে তিনি বুঝতেই পারছিলেন না কোথায় স্কুল ছিল, কোথায় বাজার ছিল। সবকিছু ঢেকে যায় পানি, পাথর ও কাদায়। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানকে খুঁজে পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব এক কাজ।
তবে জোয়ালের গল্প প্রমাণ করেছে, ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেও আশার জায়গা থাকে। একজন শিশু কয়েক ঘণ্টা গাছে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, উদ্ধারকারীরা তাকে খুঁজে পেতে পারেন, আর একটি ফোনকল একটি পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে হারানো সন্তানকে।
নেপালের বন্যায় যখন মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে এবং হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ, তখন জোয়ালের মতো প্রতিটি উদ্ধার যেন পুরো বিপর্যয়ের মধ্যে একেকটি ছোট আশার আলো। উদ্ধার অভিযান চলতে থাকায় আরও এমন জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে অসংখ্য পরিবার।
