কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি নীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা ‘অতিবুদ্ধিমত্তা’ শব্দ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ২৯ সেপ্টেম্বর জারি করা এক নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরকে এআইয়ের পরিবর্তে নতুন পরিভাষা ব্যবহারের নীতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর শুধু মানুষের বুদ্ধিমত্তার অনুকরণ বা নির্দিষ্ট কাজ স্বয়ংক্রিয় করার প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এই প্রযুক্তি মানুষের সৃজনশীলতা, গবেষণা, উৎপাদনশীলতা এবং উদ্ভাবনের সক্ষমতা বাড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি করছে। সে কারণেই প্রযুক্তির বর্তমান অগ্রগতিকে তুলে ধরতে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি বেশি উপযুক্ত বলে মনে করছে হোয়াইট হাউস।
নতুন নামের পেছনে কী যুক্তি
হোয়াইট হাউসের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আধুনিক সক্ষমতা প্রচলিত ধারণার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। ১৯৫০-এর দশকে প্রযুক্তিটির নামকরণ হওয়ার পর থেকে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে বিভিন্ন এআই ব্যবস্থা ভাষা বিশ্লেষণ, ছবি তৈরি, জটিল সমস্যা সমাধান, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি প্রযুক্তির এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে আরও ভালোভাবে তুলে ধরবে। নতুন নির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরকে সরকারি চিঠিপত্র, ওয়েবসাইট, প্রতিবেদন, নীতিপত্র ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিক যোগাযোগে নতুন পরিভাষা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
তবে এই নির্দেশনা মূলত সরকারি ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর ফলে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি খাতের প্রচলিত পরিভাষা রাতারাতি বদলে যাচ্ছে না। আইন, পূর্ববর্তী সরকারি নথি এবং চুক্তিতে থাকা পুরোনো শব্দগুলোও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে না।
প্রযুক্তি খাতে বিতর্ক
নতুন নামকরণের সিদ্ধান্তের পর প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক পক্ষের মতে, প্রযুক্তির সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। তাই প্রচলিত শব্দের পরিবর্তে নতুন পরিভাষা ব্যবহার করে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয়টি তুলে ধরা যেতে পারে।
অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, শুধু নাম পরিবর্তন করে প্রযুক্তির বাস্তব সক্ষমতা বা সীমাবদ্ধতা বদলানো যায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন ব্যবস্থা এখনো ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে, পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত দিতে পারে এবং নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে প্রযুক্তির নামের চেয়ে এর ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের প্রশাসনও এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। ফলে কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে প্রযুক্তি নীতির ভাষা নিয়েও মতপার্থক্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
বিশ্ব প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় নতুন বার্তা
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এআই গবেষণা, তথ্যকেন্দ্র, উন্নত চিপ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের নতুন নির্দেশনাকে এই বৃহত্তর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতিকে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবনী সক্ষমতা ও নেতৃত্বের বার্তা দিতে চাইছে তাঁর প্রশাসন।
তবে নাম পরিবর্তনের এই উদ্যোগ বাস্তবে সরকারি কার্যক্রমে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বাস্তবায়নের ওপর। একই সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নতুন পরিভাষাটি গ্রহণ করবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত প্রযুক্তির নামকরণের চেয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত পরিবর্তনশীল যুগে প্রযুক্তির সক্ষমতা, ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সরকার কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করবে।
