রাশিয়ার সামরিক হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তানীতির অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ঘাটতি—এই তিন বাস্তবতা ইউরোপীয় দেশগুলোকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোর নিরাপত্তা কাঠামো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ইউরোপ এখন নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইউরোপ কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সামরিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারবে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি ২০৩০ পরিকল্পনা এই প্রশ্নেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তর খোঁজার চেষ্টা। ২০২৫ সালে ঘোষিত প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্র এবং পরবর্তী রোডম্যাপের মাধ্যমে ইউরোপীয় কমিশন সামরিক বিনিয়োগ, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
রাশিয়ার হুমকি বদলে দিচ্ছে ইউরোপের চিন্তা
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। ইউরোপীয় দেশগুলো বুঝতে পারে, নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত মোকাবিলার জন্য শুধু প্রচলিত সামরিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়।
বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন। বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো, পোল্যান্ড এবং রোমানিয়া নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদারে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রতিরোধ, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের ২০২৬ সালের জুনের সিদ্ধান্তে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাড়ানো এবং কৌশলগত নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অস্ত্র উৎপাদনে যৌথ উদ্যোগ
ইউরোপের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার অন্যতম বড় সমস্যা হলো বিভিন্ন দেশের অস্ত্রব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। একই ধরনের সামরিক সরঞ্জামের জন্য বিভিন্ন দেশ আলাদা প্রযুক্তি, সরবরাহকারী এবং উৎপাদনব্যবস্থা ব্যবহার করে। ফলে খরচ বাড়ে এবং যুদ্ধের সময় যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা জটিল হয়ে পড়ে।
এই সমস্যা সমাধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যৌথ ক্রয় ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা এর লক্ষ্য।
ইউরোপীয় কমিশনের রোডম্যাপে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অন্তত ৪০ শতাংশ প্রতিরক্ষা ক্রয় যৌথভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে মোট প্রতিরক্ষা বিনিয়োগের অন্তত ৫৫ শতাংশ সংগ্রহের রাজনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কেন কঠিন
ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত যুদ্ধবিমান, গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট নজরদারি, আকাশ প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা এবং পারমাণবিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান বড়।
অনেক ইউরোপীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। ফলে প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
ইউরোপীয় কোর্ট অব অডিটরসের ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও ইউরোপের সামরিক ব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা এখনো বড় সমস্যা। এ কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি অর্জন কঠিন হতে পারে।
স্বনির্ভরতা নাকি ন্যাটোর সঙ্গে সমন্বয়
ইউরোপের প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতার অর্থ ন্যাটো থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। বরং ইউরোপীয় দেশগুলো এমন সক্ষমতা তৈরি করতে চায়, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা সীমিত হলেও প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
এখানে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন। প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় বজায় রাখাও ইউরোপীয় সরকারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে সময় প্রয়োজন। নতুন কারখানা, দক্ষ কর্মী, প্রযুক্তি এবং কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত না করে দ্রুত সামরিক সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব নয়।
ইউরোপের পরিকল্পনা তাই দীর্ঘমেয়াদি। আগামী চার বছরে যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সামরিক সমন্বয়ে অগ্রগতি ঘটাতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। তবে পূর্ণ সামরিক স্বনির্ভরতা অর্জন কতটা সম্ভব, তা এখনো অনিশ্চিত।
