বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কফিশপ চেইন স্টারবাকস আবারও বড় পরিসরে তাদের দোকান কমানোর পথে হাঁটছে। উত্তর আমেরিকাজুড়ে প্রায় ২৫০টি কফিশপ চলতি সপ্তাহেই বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যেসব শাখা প্রত্যাশিত আর্থিক ফল দিতে পারছে না কিংবা গ্রাহকদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না, মূলত সেগুলোই বন্ধ করা হবে।
স্টারবাকস জানিয়েছে, উত্তর আমেরিকায় তাদের ১৮ হাজারের বেশি কফিশপ রয়েছে। নতুন করে ২৫০টি শাখা বন্ধ হলে মোট নেটওয়ার্কের প্রায় ১ শতাংশ কমে যাবে। তবে প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই সিদ্ধান্ত উত্তর আমেরিকা থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা নয়; বরং ব্যবসাকে আরও কার্যকর ও লাভজনক করার চলমান পুনর্গঠন কর্মসূচির অংশ।
কেন বন্ধ হচ্ছে এত শাখা
স্টারবাকসের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মাইক গ্রামস কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, কোম্পানি উত্তর আমেরিকার প্রতিটি কফিশপের কার্যক্রম পর্যালোচনা করেছে। সেই পর্যালোচনায় কিছু শাখাকে এমন অবস্থায় পাওয়া গেছে, যেখানে কাঙ্ক্ষিত গ্রাহকসেবা দেওয়া কঠিন অথবা গ্রহণযোগ্য আর্থিক ফল পাওয়ার বাস্তবসম্মত পথ নেই।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্রায়ান নিকলের নেতৃত্বে চলছে ‘ব্যাক টু স্টারবাকস’ নামে পরিচিত পুনর্গঠন পরিকল্পনা। এর লক্ষ্য হলো কফিশপের পরিবেশ উন্নত করা, সেবার গতি বাড়ানো, কর্মীদের কার্যক্রম আরও কার্যকর করা এবং গ্রাহকদের আবার নিয়মিত স্টারবাকসে ফিরিয়ে আনা।
নতুন সিদ্ধান্তটি নিকলের নেতৃত্বে এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বড় দফার শাখা বন্ধের ঘটনা। এর আগে ২০২৫ সালে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে ৬২৭টি দোকান বন্ধ করা হয়েছিল এবং করপোরেট পর্যায়ে প্রায় ৯০০ কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছিল।
বন্ধ হলেও নতুন দোকান খোলার পরিকল্পনা
অবাক করার মতো বিষয় হলো, শাখা বন্ধের পাশাপাশি স্টারবাকস নতুন কফিশপ খোলার পরিকল্পনাও ধরে রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উত্তর আমেরিকায় দীর্ঘমেয়াদে তাদের সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে এবং নতুন দোকানের জন্য একটি শক্তিশালী পরিকল্পনাও তৈরি করা হচ্ছে।
তবে চলতি অর্থবছরে নতুন দোকান খোলার পূর্বাভাসও কমিয়েছে স্টারবাকস। আগে ৬০০ থেকে ৬৫০টি নতুন শাখা খোলার পরিকল্পনা থাকলেও এখন তা কমিয়ে প্রায় ৪৪০টিতে নামানো হয়েছে। অর্থাৎ কোম্পানিটি একদিকে দুর্বল শাখাগুলো সরিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তুলনামূলক সম্ভাবনাময় বাজার ও অবস্থানে ব্যবসা পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করছে।
৩শ কোটি ডলারের পুনর্গঠন ব্যয়
শাখা বন্ধের এই প্রক্রিয়ায় স্টারবাকসের বড় অঙ্কের খরচ হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, নতুন বন্ধের সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রায় ৩০ কোটি ডলারের পুনর্গঠন ব্যয় জড়িত। এর মধ্যে কর্মীদের বিচ্ছেদ সুবিধা এবং কিছু ইজারা আগেভাগে শেষ করার খরচও রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের অন্য কফিশপে স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যাদের অন্য শাখায় স্থানান্তর করা সম্ভব হবে না, তাদের বিচ্ছেদকালীন সহায়তা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে স্টারবাকস।
বিক্রি বাড়লেও কেন কাটছাঁট
স্টারবাকসের বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি সংকটময় নয়। বরং সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর আমেরিকায় বিক্রির প্রবৃদ্ধি ফিরতে শুরু করেছে। সর্বশেষ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের একই দোকানের বিক্রি ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে এবং এটি টানা চতুর্থ প্রান্তিকের উন্নতি।
তবে এই পুনরুদ্ধারের পেছনে কর্মী ও দোকান উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ করতে হয়েছে। ফলে বিক্রি বাড়লেও পরিচালন ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে। এখন স্টারবাকসের সামনে বড় প্রশ্ন হলো—গ্রাহক ফিরিয়ে আনার এই গতি ধরে রেখেই কীভাবে লাভের মার্জিন বাড়ানো যায়।
২৫০টি শাখা বন্ধের সিদ্ধান্ত সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই অংশ। অর্থাৎ স্টারবাকসের লক্ষ্য শুধু দোকানের সংখ্যা কমানো নয়; বরং কোন দোকান থাকবে, কোথায় নতুন বিনিয়োগ হবে এবং কীভাবে প্রতিটি কফিশপকে আরও কার্যকর করা যায়—সেই হিসাবেই ব্যবসাকে নতুন করে সাজানো হচ্ছে।
