সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভ এবং আগাম নির্বাচনের দাবির মধ্যে ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। তাঁর এই সিদ্ধান্তে সার্বিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা ভুচিচের পদত্যাগ শুধু একটি রাষ্ট্রীয় পদে পরিবর্তন নয়; বরং দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য ও বিরোধী রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে আগামী ২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদ নির্বাচন এবং সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন পদত্যাগ করলেন ভুচিচ
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুচিচ তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার সাত মাস আগেই পদত্যাগ করেছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে শুধু ছাত্র আন্দোলনই ছিল, এমনটি বলা যায় না। এর সঙ্গে তাঁর আগাম নির্বাচনের পরিকল্পনা এবং ক্ষমতার পরবর্তী সমীকরণও জড়িত।
২০২৪ সালের নভেম্বরে সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন।
পরবর্তী সময়ে আন্দোলন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ছিল, সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। সরকার এসব অভিযোগের কিছু অস্বীকার করেছে এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে।
ছাত্র আন্দোলনের ভূমিকা
সার্বিয়ার ছাত্র আন্দোলন মূলত দুর্নীতিবিরোধী দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি জানান।
নোভি সাদের দুর্ঘটনার পর আন্দোলনকারীদের দাবি আরও বিস্তৃত হয়। তাঁরা সংসদ নির্বাচন এগিয়ে আনা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিও তোলেন।
আন্দোলনের ফলে সরকার ও ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ে। বিভিন্ন পর্যায়ে মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের পদত্যাগ, গ্রেপ্তার এবং প্রশাসনিক তদন্তের ঘটনা ঘটে।
তবে আন্দোলনকারীদের দাবি এবং সরকারের ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে রাজনৈতিক সংকটের পূর্ণ চিত্র বুঝতে স্বাধীন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফল গুরুত্বপূর্ণ।
আগাম নির্বাচন ঘিরে নতুন লড়াই
আগামী ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ায় আগাম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এই নির্বাচনে ভুচিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি ও তাদের মিত্রদের মুখোমুখি হবে ছাত্রনেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং পশ্চিমাপন্থী বিরোধী জোট।
ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ‘স্টুডেন্টস উইন’ এবং ‘ইউরোপিয়ান সার্বিয়া’ জোটের অংশগ্রহণ নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভুচিচের পদত্যাগের পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও সামনে এসেছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রক্রিয়া ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সাবেক সংসদ স্পিকার আনা ব্রনাবিচ।
ভুচিচ জানিয়েছেন, বছরের শেষ নাগাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ভুচিচ কি আবার ক্ষমতায় ফিরবেন
প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও ভুচিচের রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তাঁর দল সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারেন।
সার্বিয়ার রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে ছাত্র আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পরিবেশ বদলেছে। বিরোধী শক্তিগুলোও নতুন সমর্থন সংগঠিত করার চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে রাশিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার প্রশ্নও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
ভুচিচের পদত্যাগ সার্বিয়ার রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং সংসদ নির্বাচন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আসে।
