দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় পর চিলির কোনো প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রীয় সফরে বলিভিয়ায় গেছেন। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস ও কূটনৈতিক দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বলিভিয়ার রাজধানী লা পাজে প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজের সঙ্গে চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তের বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অপরাধ দমনে সহযোগিতার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে।
দুই দেশের ভৌগোলিক নৈকট্য থাকলেও ইতিহাসের নানা ঘটনা তাদের সম্পর্ককে দীর্ঘদিন জটিল করে রেখেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে দেশ দুটির মধ্যে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ের পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে কনস্যুলার যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং অভিবাসনসংক্রান্ত সহযোগিতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
দীর্ঘ বিরোধের পটভূমি
চিলি ও বলিভিয়ার সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয় প্রশান্ত মহাসাগরে বলিভিয়ার প্রবেশাধিকার। উনিশ শতকের প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধের পর বলিভিয়া সমুদ্র উপকূল হারায়। এরপর থেকে দেশটি সমুদ্রে সার্বভৌম প্রবেশাধিকার ফিরে পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। স্থলবেষ্টিত বলিভিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ প্রতিবেশী চিলির বন্দর ব্যবহার করে পরিচালিত হয়।
এই বিরোধ কেবল ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; এটি বলিভিয়ার জাতীয় পরিচয়, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও জড়িত। অতীতে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত চিলির সঙ্গে আলোচনায় বসার জন্য দেশটির ওপর আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই বলে রায় দেয়। তবে বলিভিয়ার রাজনৈতিক আলোচনায় সমুদ্রপ্রবেশের দাবি এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
এবারের সফরে এই দীর্ঘদিনের বিরোধের তাৎক্ষণিক সমাধানকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু করা হয়নি। বরং দুই সরকার বাণিজ্য ও নিরাপত্তার মতো বাস্তব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
বাণিজ্য, জ্বালানি ও সীমান্ত নিরাপত্তা
চিলি ও বলিভিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বলিভিয়া চিলির বন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠায়। অন্যদিকে খনিজ সম্পদ, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক পরিবহন ব্যবস্থায় দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব।
সফরকালে দুই নেতা বাণিজ্য চুক্তি হালনাগাদ, খনিজ খাতে যোগাযোগ এবং জ্বালানি সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় সংগঠিত অপরাধ, মাদক পাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনের মতো বিষয়ও দুই দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় তথ্য বিনিময় এবং যৌথ উদ্যোগ এসব সমস্যা মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
দুই দেশ একটি যৌথ ঘোষণায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নবায়ন ও রাজনৈতিক সংলাপ গভীর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে সফরটি সম্পর্ক উন্নয়নের সূচনা হলেও দীর্ঘদিনের সব বিরোধের অবসান ঘটায়নি।
আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন বাস্তবতা
দক্ষিণ আমেরিকায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটেও এই সফর তাৎপর্যপূর্ণ। চিলি ও বলিভিয়ার বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে কিছু নীতিগত মিল রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতায় সমঝোতা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বলিভিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকি প্রত্যাহার এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। দেশটির জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যাও সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অন্যদিকে চিলির জন্য সীমান্ত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বাণিজ্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
সম্পর্কের উন্নতি কতটা সম্ভব
৭১ বছর পর রাষ্ট্রীয় সফর হওয়া প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্পর্কের স্থায়ী উন্নতি নির্ভর করবে বাস্তব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর। বাণিজ্য চুক্তি হালনাগাদ, সীমান্ত সহযোগিতা, জ্বালানি প্রকল্প এবং কনস্যুলার যোগাযোগে অগ্রগতি হলে দুই দেশের মধ্যে আস্থা বাড়তে পারে।
তবে সমুদ্রপ্রবেশের মতো ঐতিহাসিক বিরোধ অমীমাংসিত থাকায় রাজনৈতিক চাপ পুরোপুরি দূর হবে না। বলিভিয়ার ভেতরেও এই ইস্যুতে জনমত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দুই সরকারকে একদিকে সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সংবেদনশীল ঐতিহাসিক প্রশ্নে আলোচনার পথ খোলা রাখতে হবে।
চিলির প্রেসিডেন্টের এই সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে সাজানোর সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, বৈঠকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয় এবং দীর্ঘদিনের দূরত্ব কমাতে দুই দেশ কতটা ধারাবাহিকভাবে এগোতে পারে।
