রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মধ্যে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখতে নতুন করে অর্থ ছাড় করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য পরিকল্পিত ৯০ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তা ঋণ কাঠামোর আওতায় কিয়েভকে অর্থ দেওয়া হচ্ছে। এই অর্থের বড় অংশ সামরিক সরঞ্জাম, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ব্যয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখার জন্যও অর্থায়নের ব্যবস্থা রয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের নিজস্ব রাজস্বের ওপর চাপ বেড়েছে। সামরিক ব্যয় বাড়লেও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সরকারি প্রশাসনের মতো খাতে অর্থের প্রয়োজন কমেনি। একই সঙ্গে রাশিয়ার হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিবহনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো মেরামত করতেও বিপুল অর্থ দরকার হচ্ছে।
৯০ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তা কীভাবে ভাগ হচ্ছে
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিকল্পিত সহায়তা ঋণে ২০২৬ ও ২০২৭ সালের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে আনুমানিক ৬০ বিলিয়ন ইউরো এবং বাজেট সহায়তায় ৩০ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের কাঠামো রাখা হয়েছে।
অক্টোবরের প্রথমার্ধে এই কর্মসূচির আওতায় কয়েক দফায় অর্থ ছাড় হয়েছে। ২ অক্টোবর ইউক্রেনের আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য প্রায় ২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরো দেওয়া হয়। ৭ অক্টোবর প্রতিরক্ষা খাতে আরও ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ইউরো এবং ১৪ অক্টোবর ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ইউরো ছাড় করা হয়।
এসব অর্থের একটি অংশ ড্রোন, ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, বৈদ্যুতিন যুদ্ধের সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ সংগ্রহে ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে ইউক্রেনের জরুরি সামরিক চাহিদা পূরণ এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
কেন ইউক্রেনের এত অর্থ প্রয়োজন
যুদ্ধের সময় রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। সেনাবাহিনীর বেতন, অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত এবং বেসামরিক মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা চালু রাখতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়।
ইউক্রেনের নিজস্ব রাজস্ব দিয়ে এসব ব্যয় পুরোপুরি বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদেশি সহায়তা বাজেটের ঘাটতি সামাল দিতে এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান সচল রাখতে সাহায্য করছে। অর্থের ধারাবাহিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে যুদ্ধের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষায় গুরুত্ব
রাশিয়ার বিমান ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎকেন্দ্র, শহর ও অন্যান্য অবকাঠামো রক্ষায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং নজরদারির সরঞ্জাম প্রয়োজন হচ্ছে।
ড্রোনও যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক—দুই ধরনের ড্রোনের ব্যবহার বাড়ায় উৎপাদন, মেরামত এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ইউরোপীয় সহায়তার একটি অংশ ইউক্রেনের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে।
তবে অর্থ বরাদ্দ করলেই দ্রুত সরঞ্জাম পাওয়া যায় না। উৎপাদনক্ষমতা, কাঁচামালের সরবরাহ, পরিবহন এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরঞ্জাম সরবরাহে সময় লাগতে পারে।
ইউরোপের ভেতরে আর্থিক চাপ
ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর বাজেট ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে যুক্ত। একদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন রয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চাপও বাড়ছে।
ঋণভিত্তিক সহায়তার ক্ষেত্রে অর্থ ফেরত দেওয়ার শর্ত, ঋণের নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায় নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এই দায় কতটা বাড়বে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এ ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক সংস্কার ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থের ব্যবহার যথাযথভাবে যাচাই করা হলে ইউরোপীয় দেশগুলোর জনগণের কাছে সহায়তার গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা সহজ হবে।
কূটনৈতিক সমাধানের প্রশ্ন
অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনকে সহায়তা করা ইউরোপীয় নীতির একটি দিক। অন্যদিকে যুদ্ধের অবসান, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে মতপার্থক্য বড় বাধা হিসেবে রয়েছে। ফলে আর্থিক সহায়তা যুদ্ধের সক্ষমতা বজায় রাখতে পারে, কিন্তু একা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে না।
সামনে কী অপেক্ষা করছে
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যুদ্ধের মেয়াদ, সরঞ্জামের সরবরাহ, সদস্যদেশগুলোর রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং আর্থিক দায়—সবকিছুই এই উদ্যোগের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করবে।
ইউক্রেনের জন্য তাৎক্ষণিক প্রয়োজন অর্থ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা। ইউরোপের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, নিজেদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার লক্ষ্য পূরণ করা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
