ক্যাথলিক বিশ্বের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ চতুর্দশ লিওর ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার খবরে ভ্যাটিকানজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৭১ বছর বয়সী এই পোপের ডান ফুসফুসের নিচের অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা হয়েছে। অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে এবং কোনো তাৎক্ষণিক জটিলতা দেখা যায়নি বলে জানানো হয়েছে। চার দিন হাসপাতালে থাকার পর ১৭ অক্টোবর তাঁর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কথা রয়েছে।
তবে দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার লক্ষণ দেখা গেলেও ক্যানসারের পর্যায়, রোগটি কতটা বিস্তৃত এবং ভবিষ্যতে অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। পোপের স্বাস্থ্য শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বিশ্বের কোটি কোটি ক্যাথলিকের ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং ভ্যাটিকানের প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গেও এটি জড়িত।
কীভাবে শনাক্ত হলো ক্যানসার
পোপের ডান ফুসফুসে একটি অস্বাভাবিক গুটি শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। ১৩ অক্টোবর রোমের জেমেলি হাসপাতালে তাঁর ডান ফুসফুসের নিচের অংশ অপসারণ করা হয়।
অস্ত্রোপচারের পর টিস্যু পরীক্ষায় ফুসফুসের অ্যাডেনোকার্সিনোমা শনাক্ত হয়। এটি ফুসফুসের ক্যানসারের একটি পরিচিত ধরন, যা নির্দিষ্ট ধরনের কোষ থেকে তৈরি হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে, তবে রোগটির বিস্তার সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
ক্যানসারের পর্যায়, লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়েছে কি না এবং অস্ত্রোপচারের পর অবশিষ্ট কোনো ক্যানসার কোষ রয়েছে কি না—এসব তথ্য চিকিৎসার পরবর্তী সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অস্ত্রোপচারের পর পোপের অবস্থা
ভ্যাটিকানের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে এবং পোপ স্বাভাবিকভাবে জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন। চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সিদ্ধান্তও তাঁর চিকিৎসাগত মূল্যায়ন ও পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে থাকার সময়ও পোপ সীমিতভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পাশাপাশি সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং হাসপাতালের প্রার্থনাকক্ষে ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।
তবে প্রকাশ্য কার্যক্রমে দ্রুত ফিরে আসা এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়। অস্ত্রোপচারের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিয়মিত পরীক্ষা এবং চিকিৎসকদের নির্দেশনা মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসারের ভবিষ্যৎ চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা
অ্যাডেনোকার্সিনোমা ফুসফুসের ক্যানসারের সাধারণ ধরনগুলোর একটি। কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলাই চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে। কিন্তু রোগের বিস্তার ও কোষের বৈশিষ্ট্য অনুসারে অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজনও হতে পারে।
পোপের ক্যানসার কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তাঁর সম্পূর্ণ সুস্থতার সম্ভাবনা বা ভবিষ্যৎ চিকিৎসার ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
চিকিৎসকেরা অতিরিক্ত পরীক্ষার ফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী পরিকল্পনা নির্ধারণ করবেন। রোগীর বয়স, সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা এবং অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার গতি বিবেচনায় নেওয়া হবে।
পোপের দায়িত্বে কি পরিবর্তন আসবে
পোপ চতুর্দশ লিও ২০২৫ সালের মে মাসে নির্বাচিত হন। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনা, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে বক্তব্য এবং ভ্যাটিকানের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেওয়া।
অসুস্থতার কারণে তাঁর কিছু প্রকাশ্য কর্মসূচি সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়েছে। তবে চিকিৎসকেরা অনুমতি দিলে তিনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারেন।
নভেম্বরের ৬ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও পেরু সফরের পরিকল্পনা রয়েছে। সফরটি নির্ধারিত সময়ে হবে কি না, তা তাঁর সুস্থতার অগ্রগতি ও চিকিৎসাগত পরামর্শের ওপর নির্ভর করবে।
ভ্যাটিকানের সামনে কী চ্যালেঞ্জ
পোপের অসুস্থতা ভ্যাটিকানের প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বৈঠক, আন্তর্জাতিক সফর এবং অন্যান্য দায়িত্বের সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করতে হতে পারে।
তবে অসুস্থতা মানেই দায়িত্ব পালনে অক্ষমতা নয়। চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব।
পোপের দ্রুত হাসপাতাল ছাড়ার সম্ভাবনা আশাব্যঞ্জক হলেও তাঁর সম্পূর্ণ সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। আপাতত তাঁর চিকিৎসার অগ্রগতি, পরবর্তী পরীক্ষার ফল এবং কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার সময়ের দিকেই নজর থাকবে ক্যাথলিক বিশ্বের।
