যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজায় সহিংসতা থামেনি—এমনই দাবি করেছে উপত্যকাটির হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাদের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৯০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। ১০ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি বলে মন্ত্রণালয়টি জানিয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নিহতদের মধ্যে অন্তত ৩০১ জন শিশু রয়েছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। তবে মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে নিহত ব্যক্তিদের সবাই বেসামরিক ছিলেন কি না, তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয় না।
জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হতাহতের পরিসংখ্যান ব্যবহার করে আসছে। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এই সংখ্যাগুলো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী বলেছে, তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যু যে তাদের সামরিক কর্মকাণ্ডের কারণে হয়েছে—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি মূলত বড় আকারের যুদ্ধ কমানোর উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার ভিত্তিতে ইসরায়েল ও হামাস যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পরিকল্পনায় বিমান ও কামান হামলাসহ সামরিক অভিযান স্থগিত করার কথা ছিল।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় একের পর এক হামলার অভিযোগ উঠেছে। BBC Verify-এর বিশ্লেষণে বিভিন্ন হামলার ভিডিও ও ঘটনাস্থলের তথ্য পরীক্ষা করে যুদ্ধবিরতির সময় সংঘটিত বেশ কয়েকটি হামলার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রতিমাসেই ১০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। জুলাই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস—সে মাসে ১৫২ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়, যাদের মধ্যে ২১ জন শিশু।
এদিকে ইসরায়েল বলছে, গাজায় তাদের সামরিক অভিযান মূলত হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামাসের কর্মকাণ্ড এবং সম্ভাব্য হুমকি অব্যাহত রয়েছে। তাদের ভাষ্য, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা Armed Conflict Location & Event Data বা ACLED-ও যুদ্ধবিরতির সময় ইসরায়েলি হামলার বিভিন্ন ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, কিছু হামলায় হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা নিহত হয়েছেন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাও গাজার শিশুদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। UNICEF-এর হিসাবে যুদ্ধবিরতির পর ৩০০-এর বেশি শিশু নিহত হয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে তারা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছে।
সব মিলিয়ে গাজায় যুদ্ধবিরতি থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক। একদিকে ইসরায়েল নিরাপত্তা ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর হুমকির কথা বলছে, অন্যদিকে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা বেসামরিক মানুষের অব্যাহত প্রাণহানির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
ফলে যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়ন এবং গাজায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু অস্ত্রবিরতি নয়, সেটিকে টেকসই শান্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে উপত্যকাটিতে প্রাণহানি ও মানবিক সংকট অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বাড়ছে।
