ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় টাইগ্রে অঞ্চলে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী ছয় মাসের মধ্যে আঞ্চলিক নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন প্রশাসনকে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হিসেবে অঞ্চলটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, সরকারি সেবা পুনরায় চালু করা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষকে বাড়িতে ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক লড়াই, রাজনৈতিক অবিশ্বাস এবং আগের শান্তিচুক্তির দুর্বল হয়ে পড়ায় নির্বাচনের প্রস্তুতি কতটা এগোবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
নতুন প্রশাসনের দায়িত্ব কী
ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী প্রশাসন ছয় মাস দায়িত্ব পালন করবে। এই সময়ের মধ্যে অঞ্চলটির প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল করা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত, বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রত্যাবর্তনে সহায়তা এবং নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
সরকারের বক্তব্য, টাইগ্রের বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের প্রশাসন পরিচালনার সুযোগ পাওয়া প্রয়োজন। অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য শুধু সময়সূচি ঘোষণা যথেষ্ট নয়; ভোটারদের নিরাপত্তা, রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং পর্যবেক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
টাইগ্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও নাজুক। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর আঞ্চলিক রাজধানী মেকেলের নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থিত বাহিনী শহরটিতে প্রবেশ করার পর টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট বা টিপিএলএফের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাকে কীভাবে গ্রহণ করছে তার ওপর।
আগের যুদ্ধের ক্ষত এখনও গভীর
টাইগ্রে অঞ্চল ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছে। সেই সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানি, খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়া এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটে। যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে ২০২২ সালে শান্তিচুক্তি হলেও অঞ্চলটির পুনর্গঠন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার হিসাবে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেও প্রায় সাত লাখ ৫০ হাজার মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ছিলেন। অনেক পরিবার এখনও বাড়িঘর, জমি ও জীবিকার নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল এবং অন্যান্য অবকাঠামো পুনরুদ্ধার করাও বড় কাজ।
নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় এসব অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে ফিরিয়ে আনার আগে নিরাপত্তা, খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মানুষ নিজ এলাকায় ফিরলেও স্থায়ীভাবে বসবাস করা কঠিন হতে পারে।
টিপিএলএফের সঙ্গে বিরোধ
টিপিএলএফ দীর্ঘদিন টাইগ্রের রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি ছিল। ২০১৮ সালে আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসার আগে দলটি ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পরে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিরোধ বাড়তে বাড়তে ২০২০ সালে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০২২ সালের চুক্তি সংঘাত থামালেও রাজনৈতিক বিরোধ পুরোপুরি মেটেনি।
সাম্প্রতিক লড়াইয়ের পর টিপিএলএফ ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। টিপিএলএফের বক্তব্য ও অবস্থান নতুন প্রশাসনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। দলটির সমর্থকেরা যদি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার তাঁদের রাজনৈতিক অধিকারকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করছে না, তাহলে নির্বাচন নিয়ে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।
ইরিত্রিয়ার সঙ্গে উত্তেজনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
টাইগ্রে সংকট এখন শুধু ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। প্রতিবেশী ইরিত্রিয়ার সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও উত্তেজনাপূর্ণ। ইথিওপিয়া অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়ার বাহিনী তাদের ভূখণ্ডের কিছু অংশে অবস্থান করছে এবং বিদ্রোহীদের সহায়তা করছে। ইরিত্রিয়া এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দুই দেশের বাহিনী কাছাকাছি অবস্থান করায় বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কাও রয়েছে।
আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়লে শরণার্থী প্রবাহ, বাণিজ্য এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই টাইগ্রেতে নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
ছয় মাসে নির্বাচন কতটা সম্ভব
অন্তর্বর্তী প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা। ভোটের সময়সূচি নির্ধারণের আগে ভোটার তালিকা, নির্বাচনী প্রতিষ্ঠান, পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং প্রচারণার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষ ভোট দিতে পারবেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
টাইগ্রেতে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু স্থায়ী শান্তি, স্থানীয় জনগণের আস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া নির্বাচন নতুন বিরোধের কারণও হতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে টাইগ্রে আবার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগোবে, নাকি সংঘাতের চক্রে আটকে থাকবে।
