মাছকে সাধারণত খাদ্য, মৎস্যসম্পদ কিংবা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অংশ হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাছের ভূমিকা এর চেয়ে অনেক বড়। সমুদ্রের গভীরে কার্বন পৌঁছে দেওয়া এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে রাখার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ মাছ শুধু সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ নয়, পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণের অদৃশ্য ব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে, সামুদ্রিক প্রাণীদের খাদ্যগ্রহণ, বর্জ্য নির্গমন ও মৃত্যুর মাধ্যমে কার্বন গভীর সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক জীবের মাধ্যমে সমুদ্রে দীর্ঘমেয়াদি কার্বন সঞ্চয়ের প্রায় ৩০ শতাংশের সঙ্গে মাছের সম্পর্ক রয়েছে।
মাছ কীভাবে কার্বন সমুদ্রে নামায়
প্রক্রিয়াটি প্রথমে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। মাছ সমুদ্রের ওপরের স্তরে থাকা জীব ও জৈব পদার্থ খায়। তাদের দেহে সেই কার্বনের একটি অংশ জমা হয়। পরে মাছের মল বা মৃতদেহের সঙ্গে কার্বনের কিছু অংশ পানির গভীরে নেমে যায়।
বিশেষ করে মাছের মল থেকে তৈরি ক্ষুদ্র কণাগুলো সমুদ্রের গভীর স্তরে ডুবে যেতে পারে। সেখানে পৌঁছে কার্বনের একটি অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে থাকতে পারে।
একইভাবে বড় সামুদ্রিক প্রাণী মারা গেলে তাদের দেহের কার্বনও ধীরে ধীরে গভীর সমুদ্রে পৌঁছাতে পারে। ফলে প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনচক্রই এক ধরনের প্রাকৃতিক কার্বন পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করে।
গভীর সমুদ্র যেন বিশাল কার্বন ভাণ্ডার
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক কার্বন ভাণ্ডারগুলোর একটি হলো সমুদ্র। বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করার পাশাপাশি সমুদ্রের বিভিন্ন জীব ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া কার্বনকে দীর্ঘ সময়ের জন্য গভীরে আটকে রাখতে সাহায্য করে।
সমুদ্রের ওপরের স্তরে থাকা উদ্ভিদকণা ও ক্ষুদ্র জীব কার্বন গ্রহণ করে। এরপর খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে সেই কার্বন মাছসহ অন্যান্য প্রাণীর দেহে যায়। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ গভীর সমুদ্রে পৌঁছে যেতে পারে।
এই প্রক্রিয়াকে অনেক সময় সামুদ্রিক কার্বন পাম্পের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সমুদ্রের প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা বোঝার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অতিরিক্ত মাছ ধরা কেন জলবায়ুর জন্যও সমস্যা
এখানেই গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। মাছের সংখ্যা কমে গেলে শুধু মানুষের খাদ্য বা মৎস্যশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; সমুদ্রের প্রাকৃতিক কার্বন পরিবহন ব্যবস্থাও দুর্বল হতে পারে।
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৫০ সালের তুলনায় মাছের মাধ্যমে কার্বন সঞ্চয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গবেষকদের হিসাবে মাছ ধরার কারণে সেই সময় থেকে মাছের কার্বন সঞ্চয় ক্ষমতা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
অর্থাৎ অতিরিক্ত মাছ ধরা একদিকে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য কমাচ্ছে, অন্যদিকে সমুদ্রের কার্বন আটকে রাখার প্রাকৃতিক ক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে।
জলবায়ু নীতিতে নতুন হিসাব
এতদিন জলবায়ু আলোচনায় বন সংরক্ষণ, ম্যানগ্রোভ, সমুদ্রের ঘাসের বন কিংবা জলাভূমির কার্বন সঞ্চয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সামুদ্রিক প্রাণীদের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত।
নতুন গবেষণা সেই চিত্র বদলাতে পারে। মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী যে কার্বন গভীর সমুদ্রে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে, তা বিবেচনায় নিলে মৎস্য ব্যবস্থাপনা জলবায়ু নীতিরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ মাছের মজুত রক্ষা করা শুধু খাদ্যনিরাপত্তার জন্য নয়; জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সব মাছের ভূমিকা কি একই?
না। মাছের আকার, খাদ্যাভ্যাস, সমুদ্রে অবস্থানের গভীরতা এবং তাদের জীবনচক্র অনুযায়ী কার্বন পরিবহনে ভূমিকা ভিন্ন হতে পারে।
বড় মাছ দীর্ঘ দূরত্বে চলাচল করতে পারে এবং তাদের দেহে তুলনামূলক বেশি কার্বন থাকে। আবার কিছু মাছ এমন খাদ্য খায়, যা ওপরের পানির স্তর থেকে কার্বনকে খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে গভীরে পাঠাতে সাহায্য করে।
ফলে একটি মাছের গুরুত্ব শুধু তার বাজারমূল্য দিয়ে বিচার করলে পুরো পরিবেশগত মূল্য ধরা পড়ে না।
সমুদ্র রক্ষার অর্থ আরও বড়
মাছের কার্বন সঞ্চয়ের ভূমিকা জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় নতুন কোনো জাদুকরি সমাধান নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো কমানোই বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলার প্রধান উপায়। তবে সমুদ্রের প্রাকৃতিক কার্বন ব্যবস্থাকে রক্ষা করলে সেই প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করা সম্ভব।
সামুদ্রিক প্রাণীদের রক্ষা, অতিরিক্ত মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বাড়ানো এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ—এসব পদক্ষেপ একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
সমুদ্রের গভীরে তাই এমন এক অদৃশ্য কার্বন-ব্যাংক কাজ করছে, যেখানে মাছসহ অসংখ্য প্রাণী প্রতিদিন সামান্য সামান্য করে কার্বন জমা রাখতে সাহায্য করছে। তাদের ভূমিকা যত ভালোভাবে বোঝা যাবে, জলবায়ু রক্ষায় প্রকৃতির নিজস্ব ব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর সুযোগও তত বাড়বে।
