ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতের সংকট এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি নিয়ে নতুন করে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং দোকানপাটে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা রয়েছেন। তাঁদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম ও জ্বালানির ব্যয়ের চাপ কমাতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট দূর করতে হবে এবং জনসেবামূলক খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।
প্যারিস থেকে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিবাদ
ফ্রান্সের শিক্ষা খাতের সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বিস্তৃত হয়। বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকস্বল্পতা, দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ পূরণ না হওয়া, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে উৎসাহিত করে।
পরে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। জ্বালানি, আবাসন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারগুলো আর্থিক চাপে পড়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও মজুরি বৃদ্ধি, পেনশনের সুরক্ষা এবং সরকারি পরিষেবা উন্নত করার দাবিতে আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল। প্যারিসেই এক লাখের বেশি মানুষ সমাবেশে যোগ দেন বলে সরকারি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তার নিয়ে উদ্বেগ
বিক্ষোভের বেশির ভাগ মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান এবং অন্যান্য দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার করে।
কিছু এলাকায় দোকানপাটে লুটপাট, ব্যারিকেডে আগুন এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। তবে সব বিক্ষোভকারী সহিংসতায় অংশ নেননি। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীরা বলেছেন, সহিংসতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো আন্দোলনকে বিচার করা উচিত নয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশজুড়ে ১ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। আগের সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিভিন্ন শহরে তল্লাশি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।
সরকারের সামনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সরকারের জন্য এই বিক্ষোভ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে ব্যয়, বাজেট ঘাটতি এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সরকারের নীতির সমালোচনা বাড়ছে।
সরকার শিক্ষা খাতে শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত বিকল্প শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ফি বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের একাংশের মতে, এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও বিক্ষোভ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বামপন্থী নেতাদের কেউ কেউ আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে ডানপন্থী রাজনীতিকেরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন।
আন্দোলন থামবে, নাকি আরও ছড়াবে?
বিক্ষোভের পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে সরকার কতটা দ্রুত মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগ ও জনসেবার সংকট মোকাবিলা করতে পারে তার ওপর। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতেও বিভিন্ন শহরে সমাবেশ ও প্রতিবাদ চলতে পারে।
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, অর্থনৈতিক অসন্তোষ যখন শিক্ষা, আবাসন এবং সরকারি পরিষেবার সংকটের সঙ্গে মিশে যায়, তখন তা বড় সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে সহিংসতা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পার্থক্য বজায় রাখা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করাও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
