যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে কানাডার কয়েকটি পণ্যের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রিপাবলিকান দলের এক গুরুত্বপূর্ণ সিনেটরের পুনর্নির্বাচন ঘিরে বাড়তে থাকা চাপের মধ্যে এ ঘোষণা এল।
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হবে। নির্বাচনের আগে জীবনযাত্রার ব্যয়, পণ্যের দাম এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভোটারদের বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। কানাডার ওপর শুল্ক আরোপের কারণে মার্কিন ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ার অভিযোগও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
কোন কোন পণ্যে শুল্ক ছাড়
হোয়াইট হাউসের ঘোষণায় বলা হয়েছে, কানাডা থেকে আমদানি করা কয়েক ধরনের কৃষি ও শিল্পসংশ্লিষ্ট পণ্যকে অতিরিক্ত শুল্কের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হবে। এর মধ্যে রয়েছে কিছু পাতলা কাঠের শিট, কাগজজাত পণ্য, প্যাকেজিং বাক্স ও ক্রেট, শীতলীকরণ সরঞ্জাম এবং নির্দিষ্ট ধরনের কৃষিযন্ত্র।
এসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যবসা ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে কানাডার সীমান্তবর্তী মেইন অঙ্গরাজ্যের কৃষকেরা ব্লুবেরি, আপেল ও আলু উৎপাদন এবং সংগ্রহের কাজে কানাডা থেকে আসা কিছু বিশেষ সরঞ্জাম ও প্যাকেজিং উপকরণের ওপর নির্ভর করেন।
মেইনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স জানিয়েছেন, কানাডা থেকে পাওয়া এসব পণ্য স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে একই ধরনের পণ্য সহজে পাওয়া না গেলে বিকল্প সংগ্রহে খরচ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
তবে শুল্ক প্রত্যাহারের অর্থ এই নয় যে কানাডার সব পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। বরং কিছু পণ্যকে ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি নতুন কয়েক ধরনের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। নতুন তালিকায় রয়েছে নির্দিষ্ট ধরনের কার্পেট, ভালভ ও বর্জ্যজাত পণ্যসহ আরও কিছু পণ্য।
সুসান কলিন্সকে ঘিরে রাজনৈতিক হিসাব
শুল্কনীতিতে এই পরিবর্তনের পেছনে মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্সের পুনর্নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আলোচনায় এসেছে। প্রায় তিন দশক ধরে সিনেটে দায়িত্ব পালন করা এই রিপাবলিকান নেতা এবার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসনের সঙ্গে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছেন।
মেইন এমন একটি অঙ্গরাজ্য, যেখানে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের দুই পাশের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও মৎস্য খাতের ওপর শুল্কযুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। ফলে ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে স্থানীয় মানুষের অসন্তোষ কলিন্সের নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব ফেলতে পারে।
কলিন্স জানিয়েছেন, কানাডা থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের ওপর শুল্কের চাপ কমাতে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছেন। তাঁর দাবি, এই ছাড় মেইনের কৃষক, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা এই সিদ্ধান্তকে নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, শুল্কের কারণে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়ার পর এখন কিছু পণ্যে ছাড় দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব
কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বিরোধ কয়েক মাস ধরেই বাড়ছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা ভেঙে পড়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে। এর জবাবে কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।
এই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। আমদানিকারকদের ওপর শুল্কের সরাসরি চাপ পড়লেও অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধ দুই দেশের অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর কৃষি, উৎপাদন ও পরিবহন খাতের জন্য পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনের আগে চাপ কমানোর চেষ্টা?
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য শুল্কনীতির পরিবর্তনকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেনি। হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, কানাডার কথিত বৈষম্যমূলক বাণিজ্যনীতির জবাব দেওয়া এবং মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যেই পণ্যের তালিকা সংশোধন করা হয়েছে।
তবে নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা আসায় এর রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখলে কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যবিরোধ রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এই সিদ্ধান্তে সুসান কলিন্স ও মেইনের ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। তবে কানাডার সঙ্গে বৃহত্তর বাণিজ্যিক বিরোধের সমাধান না হলে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের ব্যয়ের ওপর চাপ পুরোপুরি কমবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
