যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রচারে নেমেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ২৪ অক্টোবর ওহাইওর ক্লিভল্যান্ড ও মিশিগানের ডেট্রয়েটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করেন তিনি।
৩ নভেম্বরের ভোটের আগে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই প্রধান দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে, তখন ওবামার এই প্রচার ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী কৌশলে নতুন গতি যোগ করেছে। তাঁর বক্তব্যে প্রশাসনের জবাবদিহি, পররাষ্ট্রনীতি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং হোয়াইট হাউসের সংস্কারকাজের মতো বিষয় উঠে এসেছে।
কেন নির্বাচনী প্রচারে নামলেন ওবামা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের একাংশের জন্য ভোট হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেসে দুই প্রধান দলের আসনসংখ্যা বদলে যেতে পারে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ প্রেসিডেন্টের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদারকির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এই পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোটারদের সক্রিয় করতে মাঠে নেমেছেন ওবামা। তিনি ভোটারদের কাছে নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ হিসেবে ভোটকে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
ওবামার বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হলো ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সমালোচনা করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন বাড়ানো। তাঁর প্রচার শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি আসন ঘিরে নয়; বরং কংগ্রেসে দলটির সামগ্রিক অবস্থান শক্তিশালী করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ
ক্লিভল্যান্ড ও ডেট্রয়েটের সমাবেশে ওবামা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ এবং প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রিপাবলিকান নেতাদেরও প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে।
তিনি ভোটারদের এমন প্রতিনিধিদের নির্বাচিত করার আহ্বান জানান, যাঁরা সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়াতে পারবেন। তাঁর বক্তব্যে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
তবে এসব বক্তব্য নির্বাচনী প্রচারে ওবামার রাজনৈতিক অভিযোগের অংশ। অভিযোগগুলোকে প্রতিষ্ঠিত আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের নেতারা প্রায়ই একে অন্যের নীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন।
মিশিগানে সিনেট প্রার্থীর পক্ষে প্রচার
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের পক্ষে প্রচার চালান ওবামা। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। এই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মধ্যবর্তী নির্বাচনের বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি অংশ।
ওবামার মতো সাবেক প্রেসিডেন্টের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর পরিচিতি ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা দলীয় সমর্থকদের সংগঠিত করতে এবং নির্বাচনের আগে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে তাঁর প্রচার কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর ভোটের ফল কতটা বদলাবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে ভোটারদের অংশগ্রহণ, স্থানীয় সমস্যা, প্রার্থীদের অবস্থান এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর ফলাফলের ওপর।
ইরাননীতি ও হোয়াইট হাউসের সংস্কার নিয়েও সমালোচনা
প্রচারে ওবামা ট্রাম্প প্রশাসনের ইরাননীতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে আসে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পরিবহন ও দামের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ওবামা তাঁর সমালোচনায় প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কিছু বক্তব্য এবং হোয়াইট হাউসের সংস্কারকাজ নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে হোয়াইট হাউসে সোনালি সাজসজ্জা ও নতুন বলরুম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে তিনি ট্রাম্পকে কটাক্ষ করেন।
এসব বক্তব্যের মাধ্যমে ওবামা নির্বাচনী প্রচারে প্রশাসনের নীতি থেকে শুরু করে সরকারি স্থাপনার পরিবর্তন—বিভিন্ন বিষয়কে আলোচনায় আনেন। তাঁর প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল ভোটারদের সামনে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে ধরা এবং ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সমর্থন বাড়ানো।
ট্রাম্পের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
ওবামার সমালোচনার জবাবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সাবেক প্রেসিডেন্টের শাসনকাল নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এল-সাইয়েদকেও আক্রমণ করেন তিনি।
এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখাচ্ছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রার্থী বা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। জাতীয় নেতৃত্ব, প্রেসিডেন্টের নীতি এবং দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থানও প্রচারের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে।
রিপাবলিকানরা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির পক্ষে ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি এবং নীতির প্রভাবকে সামনে আনছেন।
৩ নভেম্বরের ভোটে কী নির্ধারিত হবে
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল কংগ্রেসে কোন দল কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে, তা নির্ধারণ করবে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে আসনসংখ্যার পরিবর্তন হলে আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় এবং প্রশাসনের ওপর নজরদারির ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে।
অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতির মতো বিষয় ভোটারদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ভোটারদের মূল্যায়নও নির্বাচনী প্রচারের একটি প্রধান বিষয়।
ওবামার প্রচার ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোটারদের সক্রিয় করার একটি প্রচেষ্টা। তবে নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হবে ভোটের মাধ্যমে; তার আগে কোনো দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাবে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন ভোটারদের মনোভাব বোঝার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এর ফল শুধু দলীয় রাজনীতিতে নয়, আগামী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
