দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পাকিস্তান সফর করেছেন। সফরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কর্মসূচি ছিল। পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না করে এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তির বছরে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়ে সম্পর্ক আরও জোরদার করার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের কারণে সফরটি কৌশলগত গুরুত্বও পেয়েছে।
দশ বছর পর উচ্চপর্যায়ের সফর
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের আমন্ত্রণে মুইজ্জু রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন। ২০১৬ সালের পর দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানানো হয়।
সফরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং আনুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। বৈঠকের পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের কর্মসূচিও ছিল।
মালদ্বীপের জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার কয়েকটি বাস্তব দিক রয়েছে। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, বাণিজ্য এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো দুই দেশের আলোচনার সম্ভাব্য ক্ষেত্র। পাকিস্তানের জন্যও ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের উদ্বেগের কারণ কোথায়?
মালদ্বীপ ভৌগোলিকভাবে ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক যোগাযোগপথের কাছে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার কারণে অঞ্চলটির গুরুত্ব অনেক। ফলে মালদ্বীপের সঙ্গে অন্য আঞ্চলিক শক্তির সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে ভারতও স্বাভাবিকভাবে সেদিকে নজর রাখে।
ভারত ও মালদ্বীপের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা গেছে। মুইজ্জুর নির্বাচনী প্রচারে ‘ইন্ডিয়া আউট’ স্লোগান এবং মালদ্বীপ থেকে ভারতীয় সামরিক কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।
তবে পাকিস্তানের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্ক জোরদার হওয়াকে সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। ছোট রাষ্ট্রগুলো সাধারণত অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন সহযোগিতার স্বার্থে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।
আসিম মুনিরের প্রসঙ্গ কেন আলোচনায়?
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হলে তাঁর নাম সামনে আসা অস্বাভাবিক নয়।
তবে রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে কোনো বৈঠকের কথা উল্লেখ না থাকলে সেটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মুইজ্জুর সফরের ঘোষিত সূচিতে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা বলা হয়েছিল। তাই আসিম মুনিরের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন।
যদি দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা বা সামরিক প্রশিক্ষণ সহযোগিতা বাড়ে, তাহলে ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা নিয়ে আঞ্চলিক আলোচনায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফরের ভিত্তিতে সামরিক জোট বা নিরাপত্তা সমীকরণ বদলে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে।
মালদ্বীপের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যের চেষ্টা
মালদ্বীপের অর্থনীতি পর্যটননির্ভর। দেশটির অবকাঠামো উন্নয়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনা, আমদানি এবং সামুদ্রিক যোগাযোগের জন্য বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখে নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করাই দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ভারত মালদ্বীপের নিকটতম প্রতিবেশী এবং জরুরি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো ইসলামাবাদের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির সুযোগ দিতে পারে।
এই দুই সম্পর্ককে সব সময় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতে হবে, এমন নয়। তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়লে ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে কী বার্তা?
মুইজ্জুর পাকিস্তান সফর দেখিয়েছে, মালদ্বীপ তার বৈদেশিক সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে আগ্রহী। সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা এবং আলোচনার ফল বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা, অর্থনীতি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে।
ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে মালদ্বীপের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতা বজায় রাখা এবং ভারত মহাসাগরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখা। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও মালদ্বীপের সম্পর্কের প্রকৃত অগ্রগতি মূল্যায়ন করতে হবে বাস্তব চুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উদ্যোগের ভিত্তিতে—শুধু রাজনৈতিক জল্পনা দিয়ে নয়।
