ভারত মহাসাগরে আটকে পড়া ইরানি জাহাজ ও ট্যাংকার ঘিরে জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতির মুখে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। একদিকে সমুদ্রে বিপদে পড়া নাবিকদের মানবিক সহায়তা দেওয়া, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে কলম্বোর সামনে তৈরি হয়েছে কঠিন সিদ্ধান্তের পরিস্থিতি।
শ্রীলঙ্কার জলসীমার বাইরে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছে বেশ কয়েকটি ইরানি জাহাজ। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাত ও নৌ চলাচলে বিঘ্নের কারণে জাহাজগুলোর চলাচল ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব জাহাজের নাবিকদের খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও চিকিৎসাসেবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২৫ অক্টোবর শ্রীলঙ্কা কর্তৃপক্ষ জানায়, বিপদসংকেত পাওয়ার পর ৪০ জন ইরানি নাবিককে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার চাপের মধ্যে একটি ছোট রাষ্ট্র কীভাবে মানবিক দায়িত্ব পালন করবে।
ভারত মহাসাগরে আটকে ইরানি জাহাজ
শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিতা হেরাথ এর আগে জানিয়েছিলেন, দেশটির ১২ নটিক্যাল মাইলের আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বহু বিদেশি জাহাজ অবস্থান করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইরানি জাহাজও রয়েছে।
জাহাজগুলোর দীর্ঘ সময় একই এলাকায় অবস্থান করার পেছনে নৌ চলাচলের সমস্যা এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে বলে জানানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়। সেখানে সংঘাত বা অবরোধ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বাণিজ্যিক নৌ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানি ট্যাংকারগুলোকে ঘিরে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করলে অন্য দেশ ও কোম্পানিও আইনি বা আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ নিয়ে বিতর্ক
ইরানি জাহাজগুলোকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে এমন চাপের দাবি অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দেশটির কৌশলগত অবস্থানের কারণে আশপাশের আন্তর্জাতিক জলসীমায় বহু জাহাজ চলাচল করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নৌযানকে সহযোগিতা দেওয়া হয়।
এ কারণে পুরো ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে মার্কিন চাপের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত এবং নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতা শ্রীলঙ্কার সিদ্ধান্তকে যে জটিল করে তুলেছে, তা স্পষ্ট।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিপদে পড়া নাবিকদের জরুরি চিকিৎসা না দেওয়া মানবিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাজনক হতে পারে।
নাবিকদের চিকিৎসা ও দেশে ফেরানোর উদ্যোগ
অক্টোবরের শেষ দিকে ৪০ জন ইরানি নাবিককে চিকিৎসা দেওয়ার পর তাঁদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর গলে তাঁদের তীরে আনা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পর ইরানি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট নৌপরিবহন প্রতিনিধিদের সহায়তায় তাঁদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়।
নাবিকদের সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাহাজ দীর্ঘ সময় সমুদ্রে আটকে থাকলে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অসুস্থতা বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত তীরে আনা না গেলে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
শ্রীলঙ্কার জন্য এই পদক্ষেপ মানবিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটি কূটনৈতিক বার্তাও বহন করে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বিরোধ থাকলেও জরুরি চিকিৎসা সহায়তা এবং নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা সম্ভব।
নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
ইরানের জ্বালানি খাত এবং তেল পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ধরন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট লেনদেন বা সহযোগিতায় যুক্ত বিদেশি প্রতিষ্ঠানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটি বৈদেশিক মুদ্রা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য অবনতি কলম্বোর জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি উপেক্ষা করাও সহজ নয়। জ্বালানি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং নাগরিকদের নিরাপত্তার মতো বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়।
শ্রীলঙ্কার সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ
প্রথমত, সমুদ্রে আটকে থাকা নাবিকদের জীবন রক্ষায় দ্রুত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সামুদ্রিক আইনের সীমা মেনে চলা। তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা।
এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং মানবিক সহায়তাকে বাণিজ্যিক লেনদেন থেকে যথাসম্ভব আলাদা করে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ইরানি জাহাজগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। শ্রীলঙ্কা সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে সামুদ্রিক চলাচল স্বাভাবিক হওয়া, নাবিকদের প্রয়োজন মেটানো এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর।
