বলিউড সুপারস্টার সালমান খানকে হত্যার হুমকি, তাঁর বাড়ির বাইরে গুলিবর্ষণ এবং এবার অভিনেতা টাইগার শ্রফকে ঘিরে গুলির ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম। ভারতের অপরাধজগতের অন্যতম আলোচিত এই গ্যাংস্টার কারাগারে থেকেও কীভাবে নিজের দলের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে।
অক্টোবর ২০২৬-এ মুম্বাইয়ে টাইগার শ্রফকে ঘিরে গুলির ঘটনায় বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে এসেছে। পুলিশি আবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ছিল অর্থ আদায়, অপরাধজগতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করা। অন্যদিকে, গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সালমান খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই টাইগারকে লক্ষ্য করা হয়েছে। তবে এই দাবির সত্যতা তদন্তের বিষয়।
কে এই লরেন্স বিষ্ণোই?
লরেন্স বিষ্ণোই ভারতের পাঞ্জাব অঞ্চলে বেড়ে ওঠা এক গ্যাংস্টার, যাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং সশস্ত্র হামলাসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাঁর নাম প্রথমে উত্তর ভারতের অপরাধজগতের বিভিন্ন সংঘর্ষের সঙ্গে আলোচনায় আসে। পরে সংগঠিত অপরাধের নেটওয়ার্ক বিস্তারের অভিযোগে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁর দল বিভিন্ন রাজ্যে সহযোগী ও অপরাধচক্রের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দেওয়া, ব্যবসায়ী ও পরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থ দাবি এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনাতেও এই গোষ্ঠীর নাম উঠে এসেছে।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগের আইনি অবস্থা এক নয়। কোনো অভিযোগ, পুলিশি দাবি কিংবা গ্যাংয়ের নামে প্রকাশিত বার্তাকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধের সমতুল্য ধরে নেওয়া উচিত নয়।
সালমান খানের সঙ্গে বিরোধের সূত্রপাত কোথায়?
সালমান খান ও লরেন্স বিষ্ণোই গোষ্ঠীর বিরোধের পেছনে রয়েছে ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলা। রাজস্থানে একটি চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে বিরল প্রজাতির কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগে সালমান খানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার হরিণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষ্ণোই গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সালমান খানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পরবর্তী সময়ে অভিনেতাকে একাধিকবার হুমকি দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় তাঁর বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালায়। ওই ঘটনায় বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তে উঠে আসে।
সালমান খানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং ঘটনার তদন্তে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপরও তাঁকে ঘিরে হুমকি ও নিরাপত্তা উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
টাইগার শ্রফের ঘটনায় কী জানা গেছে?
মুম্বাইয়ে টাইগার শ্রফকে ঘিরে গুলির ঘটনায় তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে জিতিন পাঞ্চাল, সমীর খত্রী ও অঙ্কিত খাটকের নাম তদন্তের আবেদনে উঠে আসে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তদের ভূমিকা, অস্ত্র সংগ্রহ এবং অন্য সন্দেহভাজনদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার উদ্দেশ্য কেবল কোনো ব্যক্তিকে ভয় দেখানো নয়; এর মাধ্যমে অপরাধজগতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং অর্থ আদায়ের ক্ষেত্র তৈরি করাও লক্ষ্য হতে পারে। তদন্তকারীরা আরও দাবি করেছেন, অভিযুক্তরা হামলার আগে মুম্বাইয়ের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বাসভবনের আশপাশে নজরদারি চালিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা এক ব্যক্তি টাইগার শ্রফকে সালমান খানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করে হামলার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে পুলিশি তদন্তে অর্থ আদায় ও আতঙ্ক সৃষ্টির সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে।
কারাগার থেকে কীভাবে পরিচালিত হয় অপরাধচক্র?
লরেন্স বিষ্ণোই দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকলেও তাঁর গোষ্ঠীর কার্যক্রম বিভিন্ন রাজ্যে বিস্তৃত বলে তদন্তকারীরা অভিযোগ করে আসছেন। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে অপরাধচক্র পরিচালনার অভিযোগ সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে নতুন নয়।
তবে কারাগার থেকে নির্দিষ্ট কোনো হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না, তা প্রমাণ করতে তদন্তকারীদের যোগাযোগের তথ্য, আর্থিক লেনদেন, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করতে হয়। কেবল কোনো গ্যাংয়ের নাম ব্যবহার করে হুমকি দেওয়া হলেই তার পেছনে মূল নেতার সরাসরি নির্দেশ ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বিষ্ণোই গোষ্ঠীর নামে প্রচারিত বার্তাগুলোও তাই সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন। অপরাধচক্রের সদস্য বা সমর্থক পরিচয় দিয়ে কেউ বার্তা প্রকাশ করলেই সেটি সংগঠনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য কিংবা সত্য ঘটনার প্রমাণ হয়ে যায় না।
বলিউড তারকাদের নিরাপত্তায় নতুন উদ্বেগ
সালমান খানের পাশাপাশি টাইগার শ্রফের ঘটনাও বিনোদনজগতের পরিচিত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বড় তারকাদের বাসভবন, চলাচলের পথ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য অপরাধচক্রের হাতে পৌঁছালে তাঁদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশি নজরদারি, নিরাপত্তা মূল্যায়ন, সন্দেহজনক যোগাযোগের দ্রুত তদন্ত এবং আন্তরাজ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ।
লরেন্স বিষ্ণোইকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন শুধু সালমান খানের সঙ্গে পুরোনো বিরোধ নয়; বরং সংগঠিত অপরাধ, চাঁদাবাজি এবং পরিচিত ব্যক্তিদের ভয় দেখিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও।
টাইগার শ্রফের ঘটনায় তদন্তের ফল এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণই নির্ধারণ করবে, কারা হামলার সঙ্গে জড়িত এবং এর পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল।
