ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সরাসরি ফোনে কথা বলেছেন ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব এবং নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এড়িয়ে চলা পশ্চিমা ইউরোপের প্রেক্ষাপটে এই ফোনালাপকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রায় দেড় ঘণ্টার আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধ, শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে। পরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গেও কথা বলেন দুই নেতা। তবে এই উদ্যোগে শান্তি আলোচনার নতুন পথ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও রাশিয়ার অবস্থানে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায়নি।
কেন পুতিনকে ফোন করলেন দুই নর্ডিক নেতা
ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে—দুই দেশই রাশিয়ার প্রতিবেশী। ফলে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের পরিণতি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং বৃহত্তর ইউরোপীয় স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট স্টাবের দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই নেতা নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করেই এই ফোনালাপ করেছেন। তারা ইউরোপের সব দেশের পক্ষ থেকে কথা বলছেন, এমন দাবি করেননি। ইউক্রেনের সঙ্গে পরামর্শ করেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।
আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল, যুদ্ধ বন্ধে ভবিষ্যৎ সমঝোতা ও আলোচনার প্রয়োজনীয়তা সরাসরি পুতিনের কাছে তুলে ধরা। একই সঙ্গে যুদ্ধের মানবিক মূল্য, ধ্বংসযজ্ঞ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী স্টোরে মনে করেন, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতির প্রভাব বহু প্রজন্ম ধরে থাকতে পারে। অন্যদিকে স্টাবের বক্তব্য, রাশিয়ার প্রতিবেশী হিসেবে এই যুদ্ধের পরিণতি ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের পাশাপাশি সমগ্র ইউরোপের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করবে।
ইউক্রেনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেই উদ্যোগ
ফোনালাপের পর স্টাব ও স্টোরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, ইউক্রেনকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো সমঝোতা করার পরিবর্তে কিয়েভকে আলোচনার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছে। দেশটির নেতৃত্ব মনে করে, যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তবে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা উপেক্ষা করে কোনো সমাধান গ্রহণযোগ্য হবে না—কিয়েভের অবস্থান মূলত এ বিষয়েই অনড়।
আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা ঘিরেও এই ফোনালাপের গুরুত্ব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের অবসানে নতুন কোনো আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হলে ইউরোপীয় দেশগুলোও সেখানে নিজেদের স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে ধরতে চাইবে।
রাশিয়ার অবস্থানে কি পরিবর্তন এসেছে
পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পরও রাশিয়ার অবস্থানে বড় ধরনের নমনীয়তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। মস্কোর বক্তব্যে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী ও ন্যায়সংগত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাশিয়ার ঘোষিত নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর নীতির সমালোচনা করে ক্রেমলিন দাবি করেছে, পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান সংঘাত দীর্ঘায়িত করছে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভও আলোচনায় নতুন কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় দেশগুলো শান্তি আলোচনায় নিজেদের ভূমিকা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এখানেই মূল জটিলতা। ইউক্রেনের ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ, রুশ বাহিনীর দখলে থাকা অঞ্চল এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। মস্কো নিজেদের দাবিতে ছাড় দিতে আগ্রহী না হলে শুধু কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধবিরতি অর্জন কঠিন হবে।
ইউরোপের মধ্যে মতপার্থক্যও প্রকাশ্যে
ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের এই উদ্যোগ ইউরোপের অন্য কয়েকটি দেশের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্ক ও সুইডেনের নেতারা সরাসরি যোগাযোগের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও রাশিয়ার সঙ্গে এ ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্কতা ও সতর্ক নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
তবে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস বলেছেন, ইউক্রেনকে বাদ দিয়ে যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোকেও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে বলে তিনি মত দিয়েছেন।
এই ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, রাশিয়ার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ রাখা উচিত, তা নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পুরোপুরি একমত অবস্থান নেই। একদল মনে করে, সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি করা যায়। অন্যদের আশঙ্কা, যথাযথ শর্ত ও সমন্বয় ছাড়া এমন যোগাযোগ রাশিয়াকে কূটনৈতিক সুবিধা দিতে পারে।
শান্তির পথে কতটা এগোবে এই ফোনালাপ
ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের উদ্যোগকে তাৎক্ষণিক শান্তিচুক্তির সূচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে যুদ্ধের অবসান নিয়ে সরাসরি কথা বলার একটি কূটনৈতিক পথ খোলা রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আগামী আলোচনায় যুদ্ধবিরতির শর্ত, দখল করা ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ, ইউক্রেনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্ক—এসব প্রশ্ন সামনে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়ও ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সব মিলিয়ে, পুতিনের সঙ্গে এই ফোনালাপ যুদ্ধ থামানোর নিশ্চয়তা দেয়নি; বরং কূটনীতির সামনে থাকা সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা দুটোই স্পষ্ট করেছে। এখন দেখার বিষয়, সরাসরি যোগাযোগের এই উদ্যোগ বাস্তব আলোচনায় গতি আনে, নাকি দুই পক্ষের পুরোনো অবস্থানই শান্তির পথ আটকে রাখে।
