স্পেনে আবারও ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দেশটির মধ্যাঞ্চলের তোলেদো প্রদেশে একটি দ্রুতগতির ট্রেন দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনের পেছনে ধাক্কা দিলে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ পাওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ৬৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন বহু মানুষ। উদ্ধারকর্মীরা দুর্ঘটনাস্থলে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণ স্পেনগামী গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে রেল সংকেতব্যবস্থা ও পরিচালনাগত ভুলের সম্ভাবনা সামনে এলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি।
কীভাবে ঘটল ভয়াবহ দুর্ঘটনা
স্পেনের স্থানীয় সময় বুধবার সকাল ৯টার কিছু আগে মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে যাওয়া দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। দুর্ঘটনাটি তোলেদো প্রদেশের উর্দা এলাকার কাছে, মাদ্রিদ-আন্দালুসিয়া রেলপথে।
দুর্ঘটনায় জড়িত ট্রেন দুটি হলো রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফের পরিচালিত এভিই দ্রুতগতির ট্রেন এবং বেসরকারি রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইরিওর একটি ট্রেন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইরিওর ট্রেনটি রেললাইনে থেমে ছিল। এ সময় পেছন থেকে আসা রেনফের ট্রেনটি সেটিকে ধাক্কা দেয়।
সংঘর্ষের তীব্রতায় একাধিক বগি লাইনচ্যুত হয়। কয়েকটি বগি রেললাইনের পাশের ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে পড়ে ট্রেনের ভাঙা অংশ, ধাতব কাঠামো ও যাত্রীদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র।
দুটি ট্রেনে সব মিলিয়ে প্রায় ৫৪৪ জন যাত্রী ছিলেন বলে প্রাথমিক হিসাবে জানানো হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার পরপরই বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে উদ্ধার এবং আহতদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য জরুরি তৎপরতা শুরু হয়।
উদ্ধারে ব্যস্ত জরুরি কর্মীরা, বাড়ছে প্রাণহানির আশঙ্কা
দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছান দমকলকর্মী, পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। আহতদের উদ্ধার করে অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। গুরুতর আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সংঘর্ষের কারণে কয়েকটি বগি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং উদ্ধারকর্মীরা সম্ভাব্য সব জায়গায় অনুসন্ধান চালাচ্ছেন।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাঁদের জীবন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করা কঠিন।
সংকেতব্যবস্থার ত্রুটি, নাকি মানুষের ভুল
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রেল সংকেতব্যবস্থায় ত্রুটি এবং পরিচালনাগত ভুলের সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রেলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেতব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেওয়ার পর নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে ট্রেন চলাচল পরিচালনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এ সময় রেললাইনে থেমে থাকা ট্রেনটির অবস্থান সম্পর্কে পর্যাপ্ত সমন্বয় না থাকায় পেছন থেকে আসা ট্রেনটিকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে এটি এখনো তদন্তাধীন বিষয়। সংকেতব্যবস্থার ত্রুটি, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভূমিকা যাচাই না করে দুর্ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
তদন্তকারীরা ট্রেনের তথ্য সংরক্ষণকারী যন্ত্র, সংকেতের রেকর্ড, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের যোগাযোগ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরীক্ষা করছেন। এসব তথ্য বিশ্লেষণের পরই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
রেল চলাচল বন্ধ, ভোগান্তিতে যাত্রীরা
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণ স্পেনের বিভিন্ন গন্তব্যে রেল চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথে চলাচল বন্ধ থাকায় বহু যাত্রী বিপাকে পড়েছেন। যাঁরা বুধবার ওই পথে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাঁদের স্টেশনে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রেল কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনাস্থল নিরাপদ করা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পরীক্ষা এবং তদন্তের স্বার্থে চলাচল বন্ধ রেখেছে। বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও তৎপর হয়েছে।
দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তার জন্য বিশেষ যোগাযোগব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং আহতদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজও চলছে।
একই বছরে দ্বিতীয় বড় রেল দুর্ঘটনা
স্পেনের জন্য এই দুর্ঘটনা বিশেষ উদ্বেগের, কারণ চলতি বছরের জানুয়ারিতেও দেশটিতে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। দক্ষিণাঞ্চলের আদামুজ এলাকায় দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে ৪৬ জন নিহত এবং দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়েছিলেন।
সেই দুর্ঘটনার পর রেলপথের নিরাপত্তা, অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ এবং ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এবার আবারও প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্পেন ইউরোপের অন্যতম উন্নত দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কের অধিকারী। দেশটিতে রেল যোগাযোগের ওপর বিপুলসংখ্যক মানুষ নির্ভরশীল। তাই পরপর বড় দুর্ঘটনা শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা নয়, পুরো রেলব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বাড়ছে চাপ
সর্বশেষ দুর্ঘটনার পর তদন্তের পাশাপাশি রেল সংকেতব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কার্যক্রম এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ট্রেন থামানোর পদ্ধতি পর্যালোচনার দাবি জোরালো হতে পারে। বিশেষ করে একটি ট্রেন থেমে থাকার পরও পেছনের ট্রেন কীভাবে একই লাইনে এগিয়ে গেল, তার উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা। পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ করে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিপর্যয় ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া।
স্পেনের এই ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, আধুনিক রেল প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও সংকেত, যোগাযোগ ও পরিচালনায় সামান্য ভুলের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
