রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজতে আগামী নভেম্বর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে বলে জানিয়েছে মস্কো। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন করে আলোচনার উদ্যোগ যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা তৈরি করলেও বড় ধরনের অগ্রগতি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের দপ্তর ক্রেমলিন জানিয়েছে, নভেম্বরের প্রথমার্ধে আবুধাবিতে বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তিন দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। তবে যুদ্ধের মূল বিরোধগুলোতে সমঝোতা না হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।
নতুন বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে বৈঠকের চূড়ান্ত তারিখ, প্রতিনিধিদের পূর্ণ তালিকা এবং আলোচনার বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়ে আরও তথ্য প্রয়োজন।
কেন আবার আলোচনায় ফিরছে তিন দেশ
যুদ্ধের সামরিক ও অর্থনৈতিক ব্যয় দীর্ঘায়িত হওয়ায় কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই পক্ষই যুদ্ধক্ষেত্রে চাপের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানির বাজার এবং সামরিক সহায়তার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় নতুন আলোচনা আয়োজনের উদ্যোগ এসেছে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে যোগাযোগের পর। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এরপর ক্রেমলিন নতুন ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরিকল্পনার কথা জানায়।
ইউক্রেনও দ্রুত আলোচনায় বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে আলোচনার টেবিলে বসতে সম্মত হওয়া আর যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। আগের আলোচনাগুলোতে যুদ্ধবিরতি, ভূখণ্ড এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি।
ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় মতবিরোধ
সম্ভাব্য আলোচনার সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি ইউক্রেনের ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ। রাশিয়া ইউক্রেনের দখল করা অঞ্চলগুলোর ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। অন্যদিকে কিয়েভ তার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে ছাড় দিতে অনিচ্ছুক।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনের সামরিক অবস্থান এবং ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানানো হয়েছে। মস্কো যুদ্ধের পরবর্তী ব্যবস্থায় নিজেদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায়। কিয়েভের দৃষ্টিতে, কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া যুদ্ধবিরতি ভবিষ্যতে নতুন আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই বিরোধগুলো সমাধানের জন্য শুধু সাময়িক যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নাও হতে পারে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে তা পর্যবেক্ষণ করবে কে, কোনো পক্ষ শর্ত ভাঙলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সীমান্তে নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব প্রশ্নেরও উত্তর প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ
তিন দেশের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ওয়াশিংটন একদিকে ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও বজায় রেখেছে। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে ইউক্রেন ও ইউরোপের কিছু অংশে উদ্বেগ রয়েছে। কিয়েভ চায়, কোনো সমঝোতায় ইউক্রেনের নিজস্ব নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকুক। ইউরোপীয় নেতারাও মনে করেন, যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি এমন হতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে রাশিয়ার নতুন সামরিক অভিযান ঠেকানো যায়।
অন্যদিকে, রাশিয়া আলোচনায় নিজেদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবি ও যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে চাইবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা থাকলেও তিন পক্ষের স্বার্থের সংঘাত দূর করা সহজ হবে না।
যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কতটা
নভেম্বরের বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক শান্তিচুক্তি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আগের আলোচনা খুব বেশি অগ্রগতি আনতে পারেনি। ভূখণ্ড, ন্যাটো, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে পক্ষগুলোর অবস্থান এখনো অনেক দূরে।
তবে আলোচনার উদ্যোগ অন্তত কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বৈঠকে যুদ্ধবিরতির শর্ত, বন্দিবিনিময়, মানবিক সহায়তা এবং সংঘাত নিয়ন্ত্রণের মতো সীমিত বিষয়ে সমঝোতা হলে তা পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
যুদ্ধ বন্ধের জন্য শেষ পর্যন্ত প্রয়োজন হবে এমন একটি ব্যবস্থা, যা তিন পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবায়নযোগ্য। আবুধাবির সম্ভাব্য বৈঠক সেই পথে কতটা এগোতে পারে, তা নির্ভর করবে আলোচনায় পক্ষগুলো কতটা নমনীয় হয় এবং ঘোষণার বাইরে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে কতটা প্রস্তুত থাকে তার ওপর।
