ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে। ২০২০ সালে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে করা মামলার রায় আগামী ২২ ডিসেম্বর ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে আদালত। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়ায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা, চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং মৃত্যুর আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
কীভাবে মৃত্যু হয়েছিল ফুটবল কিংবদন্তির?
২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর, ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য তিনি আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেসের কাছে তিগ্রে এলাকায় একটি বাসায় অবস্থান করছিলেন। সেখানেই তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ফুসফুসে তরল জমার কথা উঠে আসে।
ম্যারাডোনার মৃত্যুতে আর্জেন্টিনাসহ বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা শোকাহত হন। খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর অসাধারণ প্রতিভা, ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতাতে ভূমিকা এবং মাঠের বাইরের বিতর্কিত জীবন তাঁকে এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করেছিল। ফলে তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি শুধু একটি চিকিৎসা-সংক্রান্ত মামলা থাকেনি; তা জাতীয় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ
মামলার কেন্দ্রে রয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর ম্যারাডোনাকে হাসপাতালে না রেখে বাসায় সুস্থ হওয়ার ব্যবস্থা করা যথাযথ ছিল কি না। তাঁর চিকিৎসায় যুক্ত সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক লিওপোলদো লুকে।
অভিযোগপক্ষের বক্তব্য, ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না। বাসায় হাসপাতালের মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম, দ্রুত ব্যবহারযোগ্য জরুরি ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা-সহায়তার অভাব ছিল বলেও অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সাক্ষ্যে তাঁর শরীরে ফোলা, দ্রুত হৃদ্স্পন্দন এবং শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণের কথা উঠে আসে। অভিযোগপক্ষের মতে, এসব লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত কি না, সেটিই মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
চিকিৎসকের দাবি, তাঁকে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে
মামলার প্রধান অভিযুক্ত লুকে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ম্যারাডোনার মৃত্যুর জন্য তাঁকে এককভাবে দায়ী করা হচ্ছে, যদিও রোগীর চিকিৎসা ও সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া ছিল জটিল। তাঁর আইনজীবীরাও দাবি করেছেন, মৃত্যুকে অবহেলার সরল ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
আদালতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি, বৈজ্ঞানিক তথ্য এবং বিভিন্ন সাক্ষীর বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ছয় মাসের শুনানিতে ৭০ জনের বেশি সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। ম্যারাডোনার কন্যারাও আদালতে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁদের একজন দালমা ম্যারাডোনা বলেছেন, তাঁর বাবা যেন ন্যায়বিচার পান—এটাই পরিবারের প্রত্যাশা।
২২ ডিসেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বিচারপ্রক্রিয়ার সমাপ্তিতে এখন আদালতের রায়ের অপেক্ষা। অভিযোগপক্ষ সাত অভিযুক্তের মধ্যে ছয়জনের জন্য চার থেকে ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড চেয়েছে। লুকের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২ বছরের সাজা চাওয়া হয়েছে। তবে সাজা হবে কি না, কিংবা অভিযুক্তদের দায় সম্পর্কে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা রায়ের আগে নিশ্চিত নয়।
মামলাটিতে মূল প্রশ্ন হলো, চিকিৎসায় কোনো ভুল বা অবহেলা হয়েছিল কি না এবং তা ম্যারাডোনার মৃত্যুর সঙ্গে আইনগতভাবে কতটা সম্পর্কিত। রোগীর জটিল স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা—সবকিছু বিবেচনা করেই আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ফুটবল বিশ্বের নজর আদালতের দিকে
ম্যারাডোনা শুধু একজন কিংবদন্তি ফুটবলার ছিলেন না; তিনি আর্জেন্টিনার সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর মৃত্যু নিয়ে মামলার রায় তাই পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশার পাশাপাশি চিকিৎসা-দায়বদ্ধতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিতে পারে।
২২ ডিসেম্বরের রায় নির্ধারণ করবে অভিযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের আইনি দায় কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে যে সিদ্ধান্তই আসুক, ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনাটি চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা এবং গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তির যত্নের দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
