ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপালের পুনরুদ্ধারে ২ কোটি মার্কিন ডলার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলাবিষয়ক জলবায়ু তহবিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আন্তর্জাতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে। তবে নেপালের পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থের তুলনায় এই সহায়তা খুবই সামান্য। ফলে দেশটির অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আরও আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন হবে।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় নেপালে প্রাণহানি, নিখোঁজের ঘটনা এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢল, নদীর পানি বৃদ্ধি ও ভূমিধসের কারণে বিভিন্ন জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা পুনর্নির্মাণের পাশাপাশি মানুষের জীবিকা ফিরিয়ে আনা এখন দেশটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলাবিষয়ক তহবিল থেকে নেপালের জন্য বরাদ্দ করা ২ কোটি ডলার এ ধরনের সহায়তার প্রথম অর্থ ছাড়। তবে নেপাল সরকার পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৪৭০ কোটি ডলার প্রয়োজন বলে হিসাব করেছে।
কেন এত ভয়াবহ হলো বন্যা?
নেপাল হিমালয় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটির ভূপ্রকৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ি নদী, খাড়া ঢাল এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে অল্প সময়ে পানির প্রবাহ বেড়ে যেতে পারে। প্রবল বৃষ্টির সময় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল নদীর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এর সঙ্গে ভূমিধস যুক্ত হলে বসতি, সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। হিমবাহ গলে যাওয়া, পার্বত্য অঞ্চলের বরফ ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তন এবং পাহাড়ের ঢালের স্থিতিশীলতা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো কিছু এলাকায় ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের অবদান নির্ধারণ করতে পৃথক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বন্যার সময় নদীর পানি বসতিতে ঢুকে পড়লে মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। আবার পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের কারণে সড়ক বন্ধ হয়ে গেলে উদ্ধারকর্মী ও ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। নেপালের মতো ভূপ্রকৃতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় দেশে এসব সমস্যা একসঙ্গে দেখা দিতে পারে।
২ কোটি ডলারের সহায়তা কীভাবে কাজে লাগবে?
জাতিসংঘের তহবিল থেকে পাওয়া অর্থ দুর্যোগের ক্ষতি মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধারের কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটানো, পুনর্বাসন এবং দুর্যোগের পর জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার মতো কার্যক্রমে এ ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হয়।
বন্যার পর শুধু ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আয় ফিরিয়ে আনা, কৃষিজমি পুনরুদ্ধার, পানীয় জলের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বন্যার ঝুঁকি কমাতে সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো আরও দুর্যোগসহনশীল করে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
তবে বরাদ্দ করা অর্থ কোন কোন প্রকল্পে কীভাবে ব্যয় হবে, তার বিস্তারিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ দ্রুত ছাড় করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া পুনরুদ্ধারের কার্যকারিতা নির্ধারণ করবে।
পুনর্গঠনে প্রয়োজন ৪৭০ কোটি ডলার
নেপাল সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠে পুনর্গঠন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রায় ৪৭০ কোটি ডলার প্রয়োজন। সে তুলনায় জাতিসংঘের তহবিলের ২ কোটি ডলার মোট প্রয়োজনের এক শতাংশেরও কম।
এই ব্যবধান দেখিয়ে দিচ্ছে, বড় ধরনের জলবায়ুজনিত দুর্যোগের পর দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পুনরুদ্ধার কতটা কঠিন হতে পারে। জরুরি ত্রাণের অর্থ দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের জন্য অনেক বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধার, আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং মানুষের জীবিকা ফিরিয়ে আনতে সরকারের নিজস্ব অর্থের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা, উন্নয়ন ব্যাংক ও অন্যান্য অংশীদারের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে।
জলবায়ু তহবিলের প্রথম অর্থ ছাড়
জাতিসংঘের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলাবিষয়ক তহবিলটি ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো যে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় অর্থায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
বিশেষ করে যেসব দেশ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে তুলনামূলকভাবে কম অবদান রেখেছে, অথচ জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছে, তাদের জন্য এ ধরনের তহবিল গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
তহবিলটির অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে বিভিন্ন দেশের সহায়তার আবেদন এবং প্রতিশ্রুত অর্থের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ সংগ্রহ ও দ্রুত বিতরণ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আরও জোরালো
নেপালের বন্যা আবারও সামনে এনেছে জলবায়ু অর্থায়নের ন্যায্যতা নিয়ে বিতর্ক। উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় তাদের পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন।
শুধু দুর্যোগের পর অর্থ দেওয়া নয়, আগাম সতর্কতা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো, কার্যকর আশ্রয়কেন্দ্র এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রস্তুতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভবিষ্যতের দুর্যোগে প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি কমানো সম্ভব হতে পারে।
নেপালের জন্য এখন তাৎক্ষণিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। জাতিসংঘের ২ কোটি ডলারের সহায়তা সেই প্রচেষ্টায় অবদান রাখবে, কিন্তু বিশাল পুনর্গঠন ব্যয় সামাল দিতে আরও অর্থের প্রয়োজন হবে।
নেপালের অভিজ্ঞতা তাই শুধু একটি দেশের দুর্যোগের গল্প নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।
