ভূমধ্যসাগরের সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে তুরস্ক ও লিবিয়ার একটি বিতর্কিত চুক্তি আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সংসদ ২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তিটির পক্ষে নতুন করে অনুমোদন দেওয়ায় গ্রিসের সঙ্গে কূটনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। মিসরও চুক্তিটি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি পরিবহন এবং সামুদ্রিক কর্তৃত্বের প্রশ্নে এই চুক্তি পূর্ব ভূমধ্যসাগরের ভূরাজনীতিকে নতুন করে আলোড়িত করছে।
তুরস্কের সঙ্গে চুক্তিটি প্রথম স্বাক্ষর করেছিল লিবিয়ার তৎকালীন জাতিসংঘ-স্বীকৃত সরকার। এতে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের একটি অংশে দুই দেশের মধ্যকার সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণের রেখা টানা হয়। তুরস্কের দাবি, চুক্তিটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দুই দেশের সামুদ্রিক অধিকার রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে গ্রিসের বক্তব্য, এই সীমানা নির্ধারণে তাদের দ্বীপগুলোর অধিকার উপেক্ষা করা হয়েছে।
চুক্তিতে আসলে কী রয়েছে
তুরস্ক ও লিবিয়ার মধ্যে ২০১৯ সালের নভেম্বরে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এতে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের একটি অংশে দুই দেশের সামুদ্রিক এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে। সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য সম্পদ অনুসন্ধানের সম্ভাবনার কারণে অঞ্চলটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সমুদ্রসীমা নির্ধারণ শুধু মাছ ধরা বা জাহাজ চলাচলের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সমুদ্রতলের খনিজসম্পদ অনুসন্ধান, জ্বালানি প্রকল্প, পাইপলাইন এবং সমুদ্রের নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের অধিকার। কোনো দেশের ঘোষিত সমুদ্রসীমা অন্য দেশের দাবির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে তা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিরোধে রূপ নিতে পারে।
তুরস্ক মনে করে, গ্রিসের দ্বীপগুলোকে ঘিরে যে বিস্তৃত সামুদ্রিক অধিকার দাবি করা হয়, তা তুরস্কের উপকূলসংলগ্ন সামুদ্রিক অঞ্চলের অধিকারকে সীমিত করে। লিবিয়ার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে আঙ্কারা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
গ্রিস কেন আপত্তি করছে
গ্রিসের আপত্তির মূল কারণ হলো, চুক্তির সীমানা নির্ধারণে ক্রিট, রোডস ও কারপাথোসের মতো গ্রিক দ্বীপগুলোর সামুদ্রিক অধিকার যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি বলে এথেন্সের দাবি। গ্রিসের মতে, দ্বীপগুলোর চারপাশে সামুদ্রিক অঞ্চল নির্ধারণের অধিকার রয়েছে এবং তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তি সেই অধিকার খর্ব করে।
গ্রিসের আশঙ্কা, চুক্তিটি ভবিষ্যতে সমুদ্রের তলদেশে জ্বালানি অনুসন্ধান, পাইপলাইন নির্মাণ এবং অন্যান্য সামুদ্রিক প্রকল্পে বাধা তৈরি করতে পারে। ফলে এথেন্স এই চুক্তিকে শুধু দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা হিসেবে দেখছে না; বরং আঞ্চলিক সামুদ্রিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নও বলেছে, কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে তৃতীয় দেশের সার্বভৌম অধিকার ক্ষুণ্ন করা উচিত নয়। তুরস্ক অবশ্য এসব আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে চুক্তিকে বৈধ বলে দাবি করছে।
মিসরের উদ্বেগ কোথায়
মিসরেরও গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ও জ্বালানি স্বার্থ রয়েছে। কায়রোর বক্তব্য, তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তি মিসরের নিজস্ব সামুদ্রিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মিসর, গ্রিস ও সাইপ্রাসের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা রয়েছে। ফলে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ এই সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি প্রকল্পে প্রভাব ফেলতে পারে।
মিসর ও গ্রিস ২০২০ সালে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নিজেদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের অংশবিশেষ নির্ধারণে একটি চুক্তি করেছিল। তুরস্ক-লিবিয়া সমঝোতার সঙ্গে এই ব্যবস্থার কিছু অংশের বিরোধ তৈরি হওয়ায় আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়েছে।
লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল কেন এখন সমর্থন দিল
লিবিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। ত্রিপোলিভিত্তিক পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রশাসন এবং পূর্বাঞ্চলভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেশটির শাসনব্যবস্থাকে জটিল করে রেখেছে।
২০১৯ সালে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ত্রিপোলির তৎকালীন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে। কিন্তু লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলভিত্তিক সংসদ ২০২০ সালে চুক্তিটির বিরোধিতা করেছিল এবং তুরস্কের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কও স্থগিত করেছিল।
সম্প্রতি সেই সংসদ চুক্তিটির অনুমোদনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এতে আঙ্কারার সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের সম্পর্কের পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তুরস্ক আগে লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় সরকারকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল; সাম্প্রতিক সময়ে পূর্বাঞ্চলের নেতাদের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
ফলে চুক্তিটি এখন শুধু জ্বালানি বা আন্তর্জাতিক আইনের বিষয় নয়, বরং লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি ও কৌশলগত স্বার্থের লড়াই
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত আবিষ্কারের পর থেকে অঞ্চলটির সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে বিরোধ বেড়েছে। বিভিন্ন দেশ সমুদ্রতলের সম্পদ অনুসন্ধান এবং জ্বালানি সরবরাহের নতুন পথ তৈরিতে আগ্রহী।
সমুদ্রসীমা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলে জ্বালানি অনুসন্ধান, পাইপলাইন নির্মাণ কিংবা সমুদ্রের নিচ দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগের মতো প্রকল্পে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ফলে তুরস্ক ও লিবিয়ার চুক্তির প্রভাব দুই দেশের বাইরেও বিস্তৃত।
চুক্তি কি নতুন আঞ্চলিক সংকট তৈরি করবে
লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সংসদের অনুমোদন তুরস্কের কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু গ্রিস ও মিসরের আপত্তি দূর করেনি। বরং বিষয়টি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন বাড়াতে পারে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে যদি কোনো পক্ষ বিতর্কিত এলাকায় জরিপ, অনুসন্ধান বা জ্বালানি কার্যক্রম শুরু করে। তবে কূটনৈতিক আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিরোধ সামাল দেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নয়, বরং অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের অধিকার নিয়ে কীভাবে সমঝোতা হয় তার ওপর। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের জ্বালানি সম্পদ ও সামুদ্রিক কর্তৃত্বের প্রতিযোগিতায় এই চুক্তি আগামী দিনগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
