ভেনেজুয়েলায় অবাধ নির্বাচনের দাবিতে আবারও রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। প্রায় দুই বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশজুড়ে সমন্বিত বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী শিবির। রাজধানী কারাকাসসহ একাধিক শহরে বিক্ষোভকারীরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে এই কর্মসূচি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কেন রাজপথে নেমেছেন মানুষ?
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি, জনগণকে ভোটের মাধ্যমে নিজেদের নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দেলসি রদ্রিগেজ। তবে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বা জাতীয় ভোটের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং রদ্রিগেজ—দুজনই ভবিষ্যতে নির্বাচনের কথা বলেছেন। কিন্তু কবে ভোট হবে, কীভাবে নির্বাচন পরিচালিত হবে এবং সব রাজনৈতিক পক্ষ সমান সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এই অনিশ্চয়তাই বিরোধীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কারণ।
বিভিন্ন শহরে সমাবেশ
রাজধানী কারাকাসের পাশাপাশি ভ্যালেন্সিয়া, মারাকে, সান ক্রিস্তোবাল ও মারাকাইবোসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা ও নির্বাচনের দাবিসংবলিত নানা স্লোগান। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সাধারণ মানুষের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিক্ষোভে তরুণদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁদের অনেকের কাছে নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দীর্ঘদিনের সংকটে মানুষের দৈনন্দিন জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে—এমন অভিযোগও শোনা গেছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনের বিতর্ক এখনো অমীমাংসিত
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন। বিরোধী শিবির দাবি করে, তাদের প্রার্থী এদমুন্দো গনসালেস উরুতিয়া ওই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন। বিরোধীদের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ভোটের হিসাবও সেই দাবির সমর্থনে তুলে ধরা হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার মাদুরোকেই বিজয়ী ঘোষণা করে। পূর্ণাঙ্গ ভোটের হিসাব প্রকাশ না করায় ফলাফল নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হয়।
বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দীর্ঘদিন ধরে অবাধ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন। তিনি বলেছেন, ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত। তবে তাঁর রাজনৈতিক আন্দোলন বর্তমানে সরকার ও বিরোধীদের একটি অংশের মধ্যে চলা আলোচনায় সরাসরি অন্তর্ভুক্ত নয়।
রাজনৈতিক সমঝোতার পথ কতটা সহজ?
অন্তর্বর্তী সরকার ও বিরোধী পক্ষের একটি অংশের মধ্যে আলোচনা চলছে। নির্বাচন আয়োজনের আগে বিচারব্যবস্থা এবং নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আনার বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে। আর বিরোধী শিবিরের সব অংশ আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত না থাকায় সমঝোতার পথ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এদিকে অতীতে সরকারবিরোধী আন্দোলনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গ্রেপ্তার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। এবারের বিক্ষোভস্থলগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল বলে জানা গেছে। তবে পরিস্থিতি ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
নির্বাচনের তারিখই এখন বড় প্রশ্ন
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু ভোটের তারিখ ঘোষণা করলেই সংকটের সমাধান হবে না। ভোটারদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ, বিরোধী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছ ভোট গণনা এবং ফলাফল যাচাইয়ের গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
দুই বছর পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ বিরোধী শিবিরের সাংগঠনিক শক্তির একটি ইঙ্গিত দিলেও, আন্দোলন কতটা রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারবে তা নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। আপাতত ভেনেজুয়েলার জনগণের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কবে তাঁরা ভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাবেন?
