পশ্চিম তীরে এক হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর অধিকৃত ভূখণ্ডে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েল। হেবরনের কাছে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন। এরপর এলাকায় অবরোধ, ঘরে ঘরে তল্লাশি এবং ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং বহু পরিবারের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হেবরনের কাছে একটি সামরিক চৌকির কাছে হামলায় দুই সেনা নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন। ইসরায়েলি বাহিনী পাল্টা গুলিতে হামলাকারীদের হত্যা করার কথাও জানিয়েছে। ঘটনার পর কর্তৃপক্ষ হামলার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানোর কথা বলেছে।
তবে অভিযানের পরিধি এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামরিক অভিযানের পাশাপাশি বাড়িঘর ধ্বংসের পদক্ষেপ পশ্চিম তীরে সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যবেক্ষকেরা।
হেবরনের ঘটনার পর অভিযান জোরদার
হেবরন পশ্চিম তীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। সেখানে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ইসরায়েলি বসতি ও সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি সংঘর্ষ, তল্লাশি এবং চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে উত্তেজনাপূর্ণ।
দুই সেনা নিহত হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনী হেবরন ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালায়। বিভিন্ন স্থানে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সীমিত করা হয়। সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তার এবং হামলার সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অভিযানের সময় ঘরবাড়ি তল্লাশি, যানবাহন চলাচল সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসাসেবা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতেও বাধা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
বাড়িঘর ধ্বংসের সিদ্ধান্তে বাড়ছে উদ্বেগ
অভিযানের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংসের সিদ্ধান্ত। নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী হামলার জবাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। এর পর হেবরনের কাছে কয়েকটি ভবন ভাঙার কাজ শুরু হয়।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা এবং হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের অভিযোগ, যেসব বাড়ি ধ্বংস করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে হামলার সরাসরি সম্পর্ক নেই। এতে নিরপরাধ পরিবারগুলোও বাসস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে।
পশ্চিম তীরে ভবন ধ্বংসের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক বিতর্কের বিষয়। ইসরায়েল বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, অনুমোদনবিহীন নির্মাণ কিংবা হামলাকারীদের পরিবারের বাড়ি ধ্বংসের যুক্তি দেয়। ফিলিস্তিনিরা এসব পদক্ষেপকে সম্মিলিত শাস্তি এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি হিসেবে দেখেন।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা একটি মৌলিক নীতি। সামরিক অভিযানে নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলেও বেসামরিক মানুষের ক্ষতি, আনুপাতিকতা এবং বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি।
নির্বাচনের আগে নিরাপত্তা ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপ
ইসরায়েলে সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই অভিযান শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব এবারের নির্বাচনী বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দুই সেনার মৃত্যু সরকারের ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চাপ বাড়িয়েছে।
নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকারের কট্টর ডানপন্থী অংশ কঠোর সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের যুক্তি, হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও হামলার ঝুঁকি থাকবে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, ব্যাপক অভিযান ও বাড়িঘর ধ্বংস দীর্ঘমেয়াদে নিরাপত্তা বাড়াবে, নাকি ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করবে। বেসামরিক মানুষের ক্ষতি এবং বাস্তুচ্যুতির ঘটনা রাজনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
পশ্চিম তীরে সংঘাতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, সামরিক অভিযান, ফিলিস্তিনি হামলা এবং পাল্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সহিংসতা বারবার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকে ব্যাপকভাবে অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যদিও ইসরায়েল এই অবস্থানের বিরোধিতা করে।
গাজা যুদ্ধ ও বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। পশ্চিম তীরে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ বাড়লে স্থানীয় উত্তেজনা অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এরপর কী হতে পারে
অভিযান কত দিন চলবে, কতজনকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং ভবন ধ্বংসের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ হামলার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার কথা বললেও ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে নিরাপদ চলাচল, চিকিৎসা এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা।
দুই সেনার মৃত্যু নিরাপত্তা উদ্বেগকে সামনে এনেছে। তবে এর জবাবে নেওয়া পদক্ষেপ বেসামরিক মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম তীরে স্থিতিশীলতা ফিরবে কি না, তা নির্ভর করবে সামরিক অভিযানের পরিধি, বেসামরিক সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার ওপর।
