আজ থেকে মাত্র ২৪ বছর পরের পৃথিবী। ক্যালেন্ডারে সাল হবে ২০৫০। তখন হয়তো আজকের অনেক পরিচিত শহর, কর্মজীবন, যানবাহন কিংবা প্রযুক্তি এতটাই বদলে যাবে যে ২০২৬ সালের জীবনকে অনেকটাই পুরোনো মনে হতে পারে। কিন্তু ২০৫০ সালের পৃথিবী কি সত্যিই উড়ন্ত গাড়ি আর রোবটে ভরা এক কল্পবিজ্ঞান সিনেমার মতো হবে?
সম্ভবত পুরোপুরি নয়। বরং জনসংখ্যার পরিবর্তন, জলবায়ু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিদ্যুৎ, নগরায়ণ এবং অর্থনীতির পরিবর্তন মিলিয়ে পৃথিবী হয়ে উঠতে পারে একই সঙ্গে আরও প্রযুক্তিনির্ভর, আরও বয়স্ক এবং কিছু ক্ষেত্রে আরও চ্যালেঞ্জপূর্ণ।
জাতিসংঘের সর্বশেষ জনসংখ্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৮২০ কোটি। মাঝারি পূর্বাভাসে ২০৫০ সালে তা বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯৬০ কোটিতে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি ধীরে ধীরে কমে আসবে।
পৃথিবীতে মানুষ বাড়বে, কিন্তু সব জায়গায় নয়
২০৫০ সালের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হতে পারে পৃথিবীর জনসংখ্যার ভৌগোলিক চিত্র।
ইউরোপ, জাপান, চীন ও রাশিয়ার মতো অনেক অঞ্চলে জনসংখ্যা কমতে পারে বা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে আফ্রিকার জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির বড় একটি অংশ আসতে পারে আফ্রিকা থেকে।
এর অর্থ হলো, আজকের অর্থনৈতিক শক্তির মানচিত্রও ধীরে ধীরে বদলাতে পারে। যে দেশগুলোতে এখন তরুণ মানুষের সংখ্যা বেশি, ভবিষ্যতে সেসব দেশ বড় শ্রমবাজার, ভোক্তা বাজার এবং নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে অনেক উন্নত দেশে প্রশ্নটি হবে ভিন্ন—কাজ করার মতো মানুষ কমে গেলে অর্থনীতি কীভাবে সচল রাখা হবে?
সেখানেই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অফিসে সহকর্মী হতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
২০৫০ সালের কর্মজীবন আজকের তুলনায় অনেকটাই আলাদা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইতিমধ্যে লেখালেখি, ছবি তৈরি, অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার তৈরি ও গ্রাহকসেবার মতো কাজে ঢুকে পড়েছে। আগামী কয়েক দশকে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হলে অনেক নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যেতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ২০৫০ সালে মানুষের কাজ থাকবে না।
বরং কাজের ধরন বদলে যেতে পারে। একজন চিকিৎসক হয়তো রোগ শনাক্ত করতে এআইয়ের সহায়তা নেবেন, একজন প্রকৌশলী জটিল নকশা তৈরি করবেন বুদ্ধিমান সফটওয়্যারের সঙ্গে কাজ করে, আর একজন সাংবাদিক তথ্য খোঁজা ও বিশ্লেষণের বড় অংশ এআইয়ের সাহায্যে করবেন।
মানুষের সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, নেতৃত্ব, সহানুভূতি ও সামাজিক যোগাযোগের মতো দক্ষতার মূল্য তখন আরও বাড়তে পারে।
গাড়ি থাকবে, কিন্তু গাড়ি চালানোর প্রয়োজন কমতে পারে
২০৫০ সালের শহরের রাস্তাও হতে পারে আজকের চেয়ে অনেক আলাদা।
স্বয়ংক্রিয় গাড়ি, বৈদ্যুতিক বাস, চালকবিহীন গণপরিবহন এবং স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থা অনেক শহরে স্বাভাবিক হয়ে যেতে পারে। গাড়ি শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং একটি চলমান কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।
শহরের ভবনগুলোও আরও বুদ্ধিমান হতে পারে। বিদ্যুতের ব্যবহার, তাপমাত্রা, পানি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনেকটাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি শহরগুলোর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হতে পারে বাসযোগ্যতা—সবুজ জায়গা, পরিষ্কার বাতাস, নিরাপদ গণপরিবহন এবং মানুষের জন্য উন্মুক্ত জায়গা।
জলবায়ু হবে ২০৫০ সালের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা
ভবিষ্যতের পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হবে জলবায়ু।
আইপিসিসির হিসাব অনুযায়ী, ১৯৯৫–২০১৪ সময়ের তুলনায় ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠ গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার বাড়তে পারে খুব কম নির্গমনের পরিস্থিতিতেও; উচ্চ নির্গমনের পরিস্থিতিতে এই পরিমাণ প্রায় ২০ থেকে ২৯ সেন্টিমিটার হতে পারে। স্থানীয়ভাবে এর প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
এর ফলে উপকূলীয় শহর ও দ্বীপাঞ্চলের জন্য ঝুঁকি বাড়বে। কিছু এলাকায় জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন বাঁধ, জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার নয়। এখনই নির্গমন কমানো গেলে ক্ষতির মাত্রা কমানো সম্ভব।
সূর্য আর বাতাস হয়ে উঠতে পারে বিদ্যুতের বড় উৎস
২০৫০ সালের পৃথিবীতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চিত্রও আমূল বদলে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার নিট-শূন্য পূর্বাভাসে ২০৫০ সালে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৭১ শতাংশ সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে আসার সম্ভাব্য পথ দেখানো হয়েছে। একই পূর্বাভাসে কম-নির্গমন উৎসগুলোর সম্মিলিত অংশ প্রায় পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থার কাছাকাছি পৌঁছায়।
এর অর্থ হতে পারে ছাদে সৌর প্যানেল, বিশাল সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র, সমুদ্রের বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং উন্নত ব্যাটারি—সবকিছুই দৈনন্দিন জীবনের আরও সাধারণ অংশ হয়ে উঠবে।
বিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন ধরনের জ্বালানি, যেমন সবুজ হাইড্রোজেন। শিল্প, জাহাজ ও বিমান চলাচলেও কম-কার্বন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে।
অর্থনীতির কেন্দ্রও বদলে যেতে পারে
২০৫০ সালের বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে শুধু কে সবচেয়ে ধনী, তা নয়; বরং কোন দেশ প্রযুক্তি, দক্ষ মানুষ, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারছে।
আফ্রিকার দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা, এশিয়ার বিশাল ভোক্তা বাজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির বিস্তার নতুন অর্থনৈতিক শক্তির জন্ম দিতে পারে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও অবকাঠামোর ওপর বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অর্থনীতি শুধু প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি হবে না; টিকে থাকার অর্থনীতিও হবে।
তাহলে ২০৫০ সালের পৃথিবী কেমন হবে?
সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তব উত্তর হলো—২০৫০ সালের পৃথিবী একেবারে কল্পবিজ্ঞানের মতোও হবে না, আবার আজকের পৃথিবীর মতোও থাকবে না।
মানুষ থাকবে আরও বেশি, কিন্তু অনেক দেশে মানুষ হবে বয়স্ক। শহর হবে আরও বড় ও স্মার্ট। গাড়ি হবে বেশি বৈদ্যুতিক ও স্বয়ংক্রিয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঢুকে পড়বে কাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সূর্য ও বাতাসের গুরুত্ব বাড়বে। আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ২০৫০ সালের পৃথিবী আজ থেকেই তৈরি হচ্ছে।
আজ আমরা কীভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি, শহর বানাচ্ছি, প্রযুক্তি ব্যবহার করছি, শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়ছি—তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে ২০৫০ সালের পৃথিবী কতটা সুন্দর, নিরাপদ ও বাসযোগ্য হবে।
হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি হবে কোনো রোবট বা মহাকাশযান নয়; বরং এমন একটি পৃথিবী তৈরি করার ক্ষমতা, যেখানে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে মানুষ এবং প্রকৃতিও ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।
