কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘অ্যাসোসিয়েট মেম্বার’ করার প্রস্তাবকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইউরোপ ও কানাডার সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, এই উদ্যোগ ‘শত্রুতামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখা হতে পারে এবং প্রয়োজনে ইউরোপের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের হুমকিও দিয়েছেন।
এর মধ্যেই কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গিয়ে ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
কেন ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন কানাডাকে ইইউর প্রথম অ্যাসোসিয়েট সদস্য করার ধারণা সামনে আনার পর ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানান।
ট্রাম্প এই সম্ভাবনাকে ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘ভয়াবহ বাণিজ্যিক অংশীদার’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, কানাডার সঙ্গে ইউরোপের এমন ঘনিষ্ঠতা যদি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে ইউরোপীয় পণ্যের ওপর আরও কঠোর শুল্ক আরোপ করা হতে পারে।
ট্রাম্পের বক্তব্যের ফলে একটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রস্তাব দ্রুত বড় ভূরাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।
কানাডার অবস্থান কী
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি ইউরোপীয় প্রস্তাবের ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা’কে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে কানাডা ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউর অ্যাসোসিয়েট সদস্য হয়ে গেছে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
কানাডার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে কানাডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। তাই ওয়াশিংটনের শুল্ক ও বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন কানাডার অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক কেন বাড়াতে চায় কানাডা
কানাডার অর্থনৈতিক কৌশলে বাজার বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর মাধ্যমে কানাডা নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ইউরোপের সঙ্গে কানাডার ইতিমধ্যে বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সহযোগিতা রয়েছে। নতুন অ্যাসোসিয়েট সদস্যপদের ধারণা বাস্তবায়িত হলে সেই সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে।
খনিজ, জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও সরবরাহ ব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রেও কানাডা-ইউরোপ সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকির অর্থ কী
ট্রাম্পের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য শুল্ক ব্যবস্থা। তিনি বলেছেন, কানাডার সঙ্গে ইউরোপের প্রস্তাবিত সম্পর্ক যদি ‘খারাপ উদ্দেশ্যে’ করা হয়, তাহলে ইউরোপের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপের কথা বিবেচনা করতে পারেন।
এতে বিষয়টি শুধু কানাডা-ইইউ সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপ তিনটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ায় তাদের মধ্যে নতুন বাণিজ্য বিরোধ তৈরি হলে তার প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে।
নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
কানাডার ইউরোপমুখী হওয়ার সম্ভাবনা উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের পুরোনো রাজনৈতিক সম্পর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ইউরোপের সঙ্গেও তার শক্তিশালী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, কানাডা কতটা দ্রুত ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারবে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিবর্তনকে কীভাবে মোকাবিলা করবে।
একদিকে কানাডা তার আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বিস্তৃত করতে চাইছে, অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বার্তা দিচ্ছে।
ফলে ‘অ্যাসোসিয়েট সদস্যপদ’ এখনো বাস্তব চুক্তিতে রূপ না নিলেও এটি ইতিমধ্যে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের কূটনৈতিক সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। সামনে কানাডা-ইইউ আলোচনা যত এগোবে, ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়াও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
