যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অতি ধনীদের সম্পদের ওপর এককালীন কর আরোপের প্রস্তাব ঘিরে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি নির্দিষ্ট সম্পদের মালিক ব্যক্তি ও ট্রাস্টের ওপর সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপ করা হতে পারে। এর মাধ্যমে ধনীদের সম্পদের একটি অংশ স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্যসহায়তা ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটারদের সামনে রয়েছে এই প্রস্তাব। তবে এখনো এটি কার্যকর আইন নয়। ভোটারদের সমর্থন ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে এর ভবিষ্যৎ। অনুমোদিত হলে অতি ধনীদের সম্পদের ওপর এককালীন কর আরোপের ক্ষেত্রে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে।
কাদের ওপর আরোপ করা হবে কর
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় শুধু বার্ষিক আয় নয়, নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও ট্রাস্টের সম্পদের মোট মূল্য বিবেচনা করা হবে। এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের আওতাভুক্ত সম্পদ থাকা ব্যক্তিদের এই কর দিতে হতে পারে।
সম্পদের তালিকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানা, শেয়ার, মূল্যবান শিল্পকর্ম, সংগ্রহযোগ্য সামগ্রী এবং মেধাস্বত্বের মতো বিষয় রয়েছে। তবে সব সম্পদ একইভাবে করযোগ্য হবে না। প্রস্তাবে আবাসনসম্পত্তি এবং নির্দিষ্ট কিছু পেনশন ও অবসরকালীন হিসাবের অর্থের ক্ষেত্রে ছাড় রাখার কথা রয়েছে।
এটি নিয়মিত বার্ষিক কর নয়; বরং এককালীন কর আরোপের উদ্যোগ। ফলে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পদের মূল্য হিসাব করে কর সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সম্পদের মূল্যায়ন, ব্যবসায়িক মালিকানার হিসাব এবং কর পরিশোধের সময়সীমা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সংগৃহীত অর্থ ব্যয় হবে কোথায়
প্রস্তাবটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির জন্য অতিরিক্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংগৃহীত করের ৯০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা খাতে এবং বাকি ১০ শতাংশ খাদ্যসহায়তা অথবা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসাসেবা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে এই অর্থ ব্যবহার করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রস্তাবটির সমর্থকদের মতে, অতি ধনীদের সম্পদের একটি অংশ কর হিসেবে সংগ্রহ করা গেলে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে। বিশেষ করে চিকিৎসাসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যয় মেটাতে এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রকৃত রাজস্ব নির্ভর করবে কতজন করের আওতায় আসবেন, তাঁদের সম্পদের মূল্য কত হবে এবং কর আদায় কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা যাবে, তার ওপর।
ধনীদের সম্পদে কর নিয়ে কেন বিতর্ক
প্রস্তাবটির বিরোধীদের আশঙ্কা, সম্পদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হলে ধনী ব্যক্তি, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে অন্য অঙ্গরাজ্যে চলে যেতে পারেন। এতে দীর্ঘ মেয়াদে রাজ্যের আয়কর আদায়, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সিলিকন ভ্যালিতে বহু উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর বিপুল সম্পদ রয়েছে। তাঁদের সম্পদের ওপর কর আরোপের প্রশ্নটি তাই শুধু রাজস্ব সংগ্রহের বিষয় নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং ব্যবসার পরিবেশও জড়িত।
অন্যদিকে সমর্থকেরা মনে করেন, ধনীদের সম্পদের একটি অংশ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে ব্যয় করা হলে সমাজের বৃহত্তর অংশ উপকৃত হতে পারে। তাঁদের মতে, সম্পদের ওপর কর আরোপের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার অর্থায়নে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের করনীতিতে কী পরিবর্তন আনতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত আয়, সম্পত্তি ও মূলধনি মুনাফার ওপর বিভিন্ন ধরনের কর আরোপ করা হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তির মোট সম্পদের মূল্য বিবেচনায় নিয়ে এককালীন কর আরোপের ধারণাটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিতর্কিত।
ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্যোগ সফল হলে সম্পদবৈষম্য, সরকারি ব্যয় এবং অতি ধনীদের কর দেওয়ার ন্যায্যতা নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা আরও জোরালো হতে পারে। অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোও ভবিষ্যতে একই ধরনের উদ্যোগ বিবেচনা করতে পারে, যদিও তা নির্ভর করবে স্থানীয় অর্থনীতি, আইন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
তবে করটি বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কর থেকে কত রাজস্ব পাওয়া গেল, স্বাস্থ্যসেবায় কতটা অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হলো এবং ধনী ব্যক্তিদের বিনিয়োগ ও বসবাসের সিদ্ধান্তে কী পরিবর্তন এল—এসবই গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।
৩ নভেম্বরের ভোট তাই শুধু একটি কর প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদবৈষম্য মোকাবিলা ও জনকল্যাণমূলক ব্যয় বাড়ানোর ধারণাটি কতটা জনসমর্থন পায়, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।
